সাক্কু ইস্যুতে কুমিল্লায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া

মো. কামাল উদ্দিন ● অবশেষে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র মনিরুল হক সাক্কু সমর্থকদের আশঙ্কা সত্যি হলো। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমাকে ১১ হাজার ভোটে পরাজিত করে দ্বিতীয় বারের মতো কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাক্কু মেয়র নির্বাচিত হন।

নির্বাচিত হওয়ার পর মামলার জালে আটকে যেতে পারেন, গেজেট-শপথ হলেও আদৌ চেয়ারে বসতে পারবেন কিনা? গ্রেফতার হতে পারেন যেকোনো সময় এমন আশঙ্কা ও গুঞ্জন ছিল বিএনপিতে।

মেয়র সাক্কু নিজেও এমন আশঙ্কা করেছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার ১৯ দিনের মাথায় মঙ্গলবার সাক্কুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন ঢাকার একটি আদালত।

এ খবর তাৎক্ষণিকভাবে সব টিভি চ্যানেল, পত্রিকা ও অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশের পর কুমিল্লাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও ভাইরাল হয়ে যায়।

সাক্কু যেকোনো সময় গ্রেফতার হতে পারেন কিংবা যেকোনো সময় তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করা হতে পারে- এমন গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়েছে নগরীতে।

দ্বিতীয় বারের মতো নির্বাচিত মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর বিরুদ্ধে মঙ্গলবার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন মহলের লোকজন মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

এ বিষয়ে কুসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ও কুসিকের সাবেক প্যানেল মেয়র আঞ্জুম সুলতানা সীমা বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। তদন্ত ও বিচারে মনিরুল হক সাক্কু দোষী হলে বিচার হওয়া উচিত। এর বেশি তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া বলেন, সাক্কু জনপ্রিয় ও নির্বাচিত মেয়র। তার বিরুদ্ধে এ মামলাটি দুদক বাদী হয়ে বিতর্কিত ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের ১/১১ সরকারের সময়ে দায়ের করেছিল।

ওই সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসনসহ অনেক রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে অনুরূপ মামলা করা হয়েছিল। মামলাটি হয়রানিমূলক।

তিনি বলেন, সরকারের উচিত কুসিকের ভোটারদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাকে মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া।

কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহ-সভাপতি ও কুমিল্লা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক আলহাজ মো. ওমর ফারুক বলেন, সাক্কুর হলফনামায় দুর্নীতির এ মামলার তথ্য রয়েছে। সে দুর্নীতি না করলে অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় পালিয়ে থাকার কথা নয়।

তিনি বলেন, গত ৫ বছরে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনে উন্নয়নের নামে যে দুর্নীতি হয়েছে এরই মধ্যে দুদক অনেক ফাইলপত্র নিয়েছে বলে শুনেছি। তদন্তের মাধ্যমে সকল দুর্নীতির তথ্য উদঘাটনসহ বিচার হওয়া উচিত।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি আলী আকবর মাছুম বলেন, সাক্কু কুমিল্লা সিটির সদ্য নির্বাচিত মেয়র। তিনি এখনো শপথ গ্রহণ করেননি বা কমিশন এখনো গেজেট প্রকাশ করেনি। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার স্বল্প সময়ের মধ্যে হঠাৎ করে এ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি জনমনে বিভ্রান্তি কিংবা নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করতে পারে।

জানা যায়, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপন করার অভিযোগে ২০০৮ সালের ৭ জানুয়ারি ঢাকার রমনা থানায় তৎকালীন মেয়র মনিরুল হক সাক্কু ও তার স্ত্রী আফরোজা জেসসিন টিকলীর বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। দুদকের সহকারী পরিচালক শাহিন আরা মমতাজ বাদী হয়ে এ মামলা করেন।

দীর্ঘ আট বছর তদন্ত শেষে গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি দুদকের সহকারী পরিচালক নুরুল হুদা আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন। তবে এ মামলার অভিযোগের দায় থেকে সাক্কুর স্ত্রীকে অব্যাহতি দেয়ার আবেদন জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা।

মঙ্গলবার এ মামলায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সিনিয়র বিশেষ জজ কামরুল হোসেন মোল্লা মামলার চার্জশিট আমলে নিয়ে সাক্কুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

এছাড়া আদালত সাক্কুর সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তার গ্রেফতার সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য আদালত আগামী ৯ মে দিন ধার্য করে রমনা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করেন।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ৪ কোটি ৫৭ লাখ ৭১ হাজার ৯৩৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ১ কোটি ১২ লাখ ৪০ হাজার ১২০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাক্কু দুদকে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেছিলেন।

গ্রেফতারি পরোয়ানার বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে মনিরুল হক সাক্কু বলেন, আমি ওই মামলায় হাজির না হওয়ার কারণে আদালত এই আদেশ জারি করেছে। ওই মামলায় সুপ্রিমকোর্ট থেকে স্থায়ী জামিন নিয়েছিলাম।

আমার আইনজীবী বিষয়টি আদালতের কাছে উল্লেখ না করায় এমন আদেশ হয়েছে দাবি করে সাক্কু আরও বলেন, আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে আগামীকাল (বুধবার) এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেব।

তিনি আরও বলেন, সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় কমিশনে দাখিল করা হলফনামায়। আমি যে ১২টি মামলার (চলমান, অব্যাহতি, খালাস, মুক্তি) বিবরণ উল্লেখ করেছিলাম এর মধ্যে দুদকের এ মামলাটি ছিল ১ নম্বর ক্রমিকে এবং যা আমলে গ্রহণের জন্য শুনানির অপেক্ষায় ছিল।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি সালের কুসিকের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী অধ্যক্ষ আফজল খানকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন মনিরুল হক সাক্কু।

চলতি বছরের ৩০ মার্চ কুসিকের দ্বিতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ও অধ্যক্ষ আফজল খানের মেয়ে আঞ্জুম সুলতানা সীমাকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু। এ নির্বাচনে সাক্কু পান ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট এবং আঞ্জুম সুলতানা সীমা পান ৫৭ হাজার ৮৬৩ ভোট।

error: দুঃখিত কুমিল্লার বার্তার কোন কনটেন্ট কপি করা যায় না।