লাকসামে ১৮০০’শ টন খাদ্যশস্য আত্মসাৎ

কুমিল্লার বার্তা রিপোর্ট ● সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে হাওয়া হয়ে গেছে প্রায় এক হাজার ৮০০ টন খাদ্যশস্য। গুদামের রক্ষক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-এলএসডি) একেএম মহিউদ্দিন নিজেই এ বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আত্মসাৎ করেছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর।

আত্মসাৎ করা এ খাদ্যশস্যের সরকারি মূল্য প্রায় ছয় কোটি টাকা। তবে এর বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকারও বেশি।

ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার লাকসামের দৌলতগঞ্জ খাদ্য গুদামে। সম্প্রতি খাদ্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দৌলতগঞ্জ খাদ্য গুদামের এ ভয়াবহ লুটের তথ্য উঠে আসে।

এদিকে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে খাদ্য কর্মকর্তা একেএম মহিউদ্দিন নানা দেন-দরবার চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। তিনি আড়াই কোটি টাকার চেক দিয়ে বিষয়টি সমঝোতার চেষ্টাও করেন। চালানপত্রসহ আনুষঙ্গিক প্রমাণাদি গোপন করে এ ধরনের জালিয়াতি এর আগে খাদ্য বিভাগে ঘটেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে খাদ্য অধিদপ্তর। ইতিমধ্যে অধিদপ্তর থেকে সারাদেশের সরকারি খাদ্য গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সতর্কতামূলক চিঠি পাঠানো হয়েছে। মহিউদ্দিন অন্য যেসব খাদ্য গুদামে কর্মরত ছিলেন, সেখানেও কোনো অনিয়ম হয়েছে কি-না তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

যোগাযোগ করা হলে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, অভিযুক্ত মহিউদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাটি দুদক তদন্ত করবে। এ ধরনের অপরাধী যাতে কোনোভাবেই পার পেতে না পারে সে বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরসহ পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান মন্ত্রী। একেএম মহিউদ্দিনের খাদ্যশস্য আত্মসাতের ঘটনায় খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সালাউদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রমাণাদি সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ করতে আরও ১৫ দিন সময় চাওয়া হয়েছে। তাই এখনই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। এ ঘটনায় লাকসাম উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. এনামুল হক ভুঁইয়া বাদী হয়ে গত ১৮ এপ্রিল লাকসাম থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।

লাকসাম থানার ওসি (তদন্ত) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহফুজ জানান, মামলা দায়েরের পর থেকে অভিযুক্ত খাদ্য কর্মকর্তা মহিউদ্দিন আত্মগোপনে রয়েছেন। একেএম মহিউদ্দিন ২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি লাকসামের দৌলতগঞ্জ খাদ্য গুদামের ওসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর পদোন্নতি পেলে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে তাকে বদলি করা হয়। কিন্তু তিনি নতুন কর্মস্থলে না গিয়ে দৌলতগঞ্জ খাদ্য গুদামের ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে কর্মস্থল ত্যাগ করার পরপরই তার দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসে। এ সময় ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে আত্মসাৎকৃত খাদ্যশস্য কিনে দেওয়ার অঙ্গীকার করে সমঝোতার চেষ্টা করেন। ওই সময় তিনি খাদ্যশস্যের মূল্য বাবদ আড়াই কোটি টাকার কয়েকটি চেক দেন। তার শ্বশুর ও ভাইসহ ৫ নিকটাত্মীয়ের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এসব চেক বর্তমানে কুমিল্লা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে রক্ষিত রয়েছে। থানায় দায়েরকৃত মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, দৌলতগঞ্জ খাদ্য গুদামে মহিউদ্দিনের দায়িত্ব পালনকালীন পুরো সময়ের ওপর করা বিশেষ নিরীক্ষায় ৯৮৯.৫২৯ টন চাল এবং ৭২৫.৭১৩ টন গম খাদ্য গুদামে না দেখিয়ে, মজুদ না করে আত্মসাতের প্রমাণ উঠে আসে, যার আনুমানিক সরকারি মূল্য ছয় কোটি টাকা।

একই সঙ্গে আড়াই হাজার পিস খালি বস্তা বিক্রি করে দেওয়ারও তথ্য পায় বিশেষ নিরীক্ষা দল। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, খাদ্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় ২০১৫ সালের ১২ জুলাই থেকে ২০১৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত সময়ের কিছু অনিয়ম উঠে আসে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই এক বছরে ১৭টি চালানের বিপরীতে ২৫০.৪৩৭ টন গম ও ৩৬টি চালানপত্রের বিপরীতে ৫৭৪.৩১৩ টন চালের কোনো হদিস গুদামে পাওয়া যায়নি।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী ৮২৪.৭৫০ টন চাল ও গম ওই গুদামে পাঠানো হয়েছে। তবে খাদ্য গুদামের রেকর্ডপত্রে ওইসব চালানপত্রের কোনো কপিও পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটির প্রাথমিক তদন্তে মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে চাল ও গম আত্মসাতের সত্যতা উঠে আসে। তদন্ত কমিটির এক সদস্য সমকালের সঙ্গে আলাপকালে এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, খাদ্য বিভাগে নানা ধরনের চুরির ঘটনা ঘটে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়। কিন্তু চালানপত্র, খামাল কার্ড, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ ঊর্ধ্বতনদের গুদাম পরিদর্শন বইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণাদি গোপন করে খাদ্যশস্য আত্মসাতের এ ঘটনা অভিনব।

মহিউদ্দিন এর আগে কুমিল্লার দাউদকান্দি সরকারি খাদ্য গুদাম, চান্দিনা সরকারি খাদ্য গুদামসহ তিনটি গুদামের ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ওইসব গুদামে দায়িত্ব পালনকালে একই ধরনের লুটের ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারেন। এরই মধ্যে ওইসব গুদামে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর।

খাদ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, কিছু অলিখিত নিয়ম-কানুন খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে প্রশ্রয় দেয়। তার মধ্যে অন্যতম খাদ্যশস্য আত্মসাৎ ধরা পড়লে তার আর্থিক মূল্য পরিশোধ করে বিভাগীয় মামলা থেকে মুক্তি পাওয়া। একেএম মহিউদ্দিনও একই উপায়ে নিজের অপরাধ চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। খুব কম সময়ের মধ্যে তার পুরো জালিয়াতির চিত্র প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার এ মুচলেকা প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তারা বলেন, মামলায় আত্মসাৎকৃত খাদ্যশস্যের দাম কমিয়ে দেখানো হয়েছে। বাস্তবে এ খাদ্যশস্যের বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকার ওপরে।

অভিযোগ সম্পর্কে খাদ্য কর্মকর্তা একেএম মহিউদ্দিনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার পেছনে শত্রু লাগছে। আমি একটু ভালোভাবে চলাফেরা করি, এটা অনেকেই সহ্য করে না। তাই তারাই পরিকল্পিতভাবে এসব কুৎসা রটাচ্ছে।’ নিজেকে ভালো মানুষ দাবি করে মহিউদ্দিন বলেন, ‘এ সময়ে আসলে ভালো মানুষ ভালোভাবে চলতে পারে না।’