বৃহত্তর কুমিল্লায় মাছ চাষ বৃদ্ধি পাবে ৩০ ভাগ

এম ফিরোজ মিয়া ● বৃহত্তর কুমিল্লা মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্প এ অঞ্চলে মাছ চাষ ৩০ ভাগ বৃদ্ধি করবে। এ লক্ষ্যে ২১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ বছর মেয়াদি এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এ প্রকল্পের আওতায় বৃহত্তর কুমিল্লার চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার ৩৪টি উপজেলার পেশাদার মৎস্য চাষিসহ সাধারণ চাষিরা উপকৃত হবে। সেই সঙ্গে এ অঞ্চলের মাছ চাষে নতুন মাত্রা যোগ হবে।

জানা গেছে, মাছ উৎপাদনে বৃহত্তর কুমিল্লা দেশে অগ্রণী অবস্থানে রয়েছে। বৃহত্তর কুমিল্লার ৩ জেলার মধ্যে শুধু কুমিল্লা জেলা মাছ উৎপাদনে দেশে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এ জেলার নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে বছরে গড়ে সোয়া লাখ টনেরও বেশি মাছ বাড়তি উৎপাদন হয়, যা সারাদেশের চাহিদার যোগান দেয়া হচ্ছে। বৃহত্তর কুমিল্লার মাছ দেশের অন্য জেলার মাছের চাইতে অনেক সুস্বাদু। এ অঞ্চলের মাটি ও পানি প্রাকৃতিকভাবেই মাছ চাষের জন্য উপযুক্ত বলে জানায় কৃষি বিভাগ। কুমিল্লার দাউদকান্দির প্লাবনভূমিতে মৎস্য চাষ আজ সারাদেশে একটি মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বৃহত্তর কুমিল্লার মাটি ও পানির সুযোগকে কাজে লাগাতেই বৃহত্তর কুমিল্লা মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

বৃহত্তর কুমিল্লা মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে মৎস্য সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, মাছ চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়নের উদ্দেশ্য নিয়ে এ প্রকল্পের সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় সরকারি খাস পুকুর, বিল ও জলাভূমি খনন, পুনঃখনন, মাছের অভয়াশ্রম স্থাপন, জাল বিনিময়, মৎস্য আইন বাস্তবায়ন, মৎস্য চাষি প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ, নিবন্ধিত জেলেদের প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তা প্রদান, প্রদর্শনী খামার স্থাপন কর্মসূচিসহ নানামুখী কর্মসূচি রয়েছে। এ পর্যন্ত এ প্রকল্পে ৩০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রকল্পের মনিটরিং ও মূল্যায়ন কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক জানান, ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদি এ প্রকল্প শুরু হয়েছে ২০১৫ সালের জুন মাসে। এটি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়ন হচ্ছে। তিনি বলেন, এ যাবৎ প্রতিটি উপজেলায় ১টি করে প্রদর্শনী খামার তৈরি হয়েছে, সুবিধাভোগী জেলেদের আয়বর্ধক সুবিধা দেয়া হয়েছে, ৩ হাজার ৬০০ জন জেলেকে বিকল্প আয়ের জন্য সুবিধা দেয়া হয়েছে, প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে ১ হাজার ৬০ জন চাষিকে। খাঁচায় মাছ চাষের ১৮টি প্রকল্পে ১৮০টি খাঁচা স্থাপন করা হয়েছে, এ যাবৎ ২৪টি বিল খনন করা হয়েছে, চাষিদের জন্য প্রদর্শনী খামার করা হয়েছে ৩৮টি, পেন পদ্ধতিতে ৩২টি প্রকল্পে মাছ চাষ করা হয়েছে। এ ছাড়াও প্রকল্পের আওতাধীন সব খাতেই কাজ চলছে। তিনি বলেন, বৃহত্তর কুমিল্লার মাছ চাষিদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনেরও বরাদ্দ রয়েছে এ প্রকল্পে। সহসাই এ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।

এদিকে এ প্রকল্প সম্পর্কে বেশ কিছু চাষির কাছ থেকে অসহযোগিতাসহ নানা অভিযোগ পওয়া গেছে। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বেশ কয়েকজন চাষি অভিযোগ করে বলেন, এ প্রকল্পে দলীয় লোকদেরই বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ ও কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে এ অনিয়ম হচ্ছে। তারা বলেন, প্রশিক্ষণ, উপকরণ, অনুদান প্রদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অনিয়ম রয়েছে। এ প্রকল্পকে সঠিক তদারকি করা হয় না বলেই এমন হচ্ছে বলে জানান তারা। চাষিরা বলেন, কুমিল্লায় মাছ চাষে এখনই নীরব বিপ্লব চলছে। বেসরকারি খাতেই এর উন্নয়ন হচ্ছে। বৃহত্তর কুমিল্লা প্রকল্প স্বচ্ছ হলে এর সুবিধা সঠিক মাছ চাষি এবং জেলেরা পেলে এখানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে বাধ্য। তারা বলেন, এ বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সুবিধা বৃহত্তর কুমিল্লার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশও পাবে।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে বৃহত্তর কুমিল্লা মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মো. জাহিদ হোসেন বলেন, এ প্রকল্পটি শতভাগ স্বচ্ছভাবেই চলছে। এ প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক ছড়ানোর কোনো অবকাশ নেই। প্রকৃত চাষি ও জেলেরা যাতে উপকার পায় সে লক্ষ্যেই কাজ চলছে। তিনি বলেন, সরকারিভাবে যারা নিবন্ধিত জেলে ও চাষি তাদের তালিকা আমরা উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের মাধ্যমে আনি। সেই তালিকা অনুযায়ী যাদের সত্যিকার অর্থে দরকার তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেবা দিচ্ছি। অগ্রাধিকার তালিকায় যারা নেই তারা হয়তো ক্ষোভে না জেনে অভিযোগ করছেন। তিনি বলেন, বৃহত্তর কুমিল্লা মৎস্য চাষ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কুমিল্লা অঞ্চলে মাছ চাষের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। তিনি বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ প্রাপ্তরাই ৫ বছর পর কুমিল্লাকে মাছ চাষে অনেক দূর এগিয়ে নেবে।

error: দুঃখিত কুমিল্লার বার্তার কোন কনটেন্ট কপি করা যায় না।