কুমিল্লাতেই কি হচ্ছে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর?

নিজস্ব প্রতিবেদক ● প্রতি মিনিটে একটি করে ফ্লাইট ওঠানামা। বছরে কমপক্ষে এক কোটি ২০ লাখ যাত্রীর চেক ইন ও চেক আউট। বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই মাত্র আধা ঘণ্টায় কোন ধরনের যানজট ছাড়াই জিরো পয়েন্টে পৌঁছার সুবিস্তৃত সড়ক। চব্বিশ ঘণ্টা ৪ শ’ যাত্রীবাহী ফ্লাইট ও ২শ’ কার্গোবাহী ফ্লাইট অপারেশন। এমনই অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা বিবেচনায় রেখে বিশ্বমানের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিমানবন্দরের সমীক্ষার কাজ চলছে।

জাপানের শীর্ষস্থানীয় নির্মাণ সংস্থা নিপ্পনের দুই ডজন বিশেষজ্ঞ দিনরাত কাজ করছেন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল এ মেগা প্রকল্পের।

তারা বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য প্রাথমিক সমীক্ষায় কুমিল্লায় ২টি স্থান নির্বাচন করেছেন। গুগল ম্যাপে দেখে তারা ঐ স্থান গুলো জানুয়ারিতে পরিদর্শন করে। ম্যাপে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পাশে ১ কিলোমিটার দূরত্বে চান্দিনা- দেবিদ্বার সড়ক সংলগ্ন সুবিশাল ফসলী মাঠ তাদের নজর কাড়ে। নবিয়াবাদ এলাকার ওই মাঠটি বরকামতা ও সুলতানপুর ইউনিয়ন অধীনে। ফসলী ওই মাঠের উত্তরে রাধানগর দক্ষিণে জাফরাবাদ-কুরছাপ, পূর্বে নবিয়াবাদ-ভৈষেরকুট-কুরুইন এবং পশ্চিমে মনিপুর-কুয়ারপাড় এলাকা রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনা-বাগুর বাস স্টেশন থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার উত্তরে ওই মাঠ।

গুগল নির্ধারিত অপর স্থানটি বরুড়া উপজেলার ঝলম ইউনিয়ন থেকে পর্যবেক্ষণ করা শুরু হলেও স্থানটির সন্ধান পাওয়া যায় চান্দিনা উপজেলার জোয়াগ ইউনিয়নে। ওই ইউনিয়নের সুবিশাল ফসলী মাঠের উত্তরে চান্দিনা উপজেলার ওরাইন, দক্ষিণে বরুড়া উপজেলার কৃষ্ণপুর-বোম্বাইশ, পূর্বে জোয়াগ এবং পশ্চিমে কুদুটি গ্রামের অবস্থান।

যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া বাস স্টেশন থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মাধাইয়া-রহিমানগর সড়ক সংলগ্ন ওই মাঠের অবস্থান।

ধারণা করা হচ্ছে, গুগল ম্যাপ দেখে জাপানী জরিপ দল কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার জোয়াগ ইউনিয়ন এবং দেবিদ্বার উপজেলার বরকামতা ইউনিয়নে পরিদর্শনকৃত ২টি স্থানের মধ্যে তুলনা মূলকভাবে দেবিদ্বার উপজেলার নবিয়াবাদ এলাকার স্থানটি অধিকতর গুরুত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বখ্যাত ইনসিওন এয়ারপোর্টের আদলেই তৈরি করা হবে স্বপ্নের এ এয়ারপোর্ট।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই এ প্রকল্প উদ্বোধনের বিষয় বিবেচনায় রেখেই চলছে তাদের কর্মকান্ড।

আগামী এক শ’ বছরের প্রয়োজন বিবেচনায় উপযোগী জমি খুঁজতে কুমিল্লা ছাড়াও ইতোমধ্যে মুন্সীগঞ্জের আড়িয়াল বিল, পদ্মার ওপারের চরজানাজাতসহ বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেছেন তারা।

জানা যায়, বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট শুধু সিভিল এভিয়েশন নয়, গোটা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প। কমপক্ষে দুটো পদ্মা সেতুর সমান ব্যয়ে নির্মিত হবে এ এয়ারপোর্ট। জমি চূড়ান্ত করার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যেই ড্রয়িং ডিজাইন তৈরি করা হবে। এরপর আগামী ডিসেম্বরে সমীক্ষা প্রতিবেদন হাতে পেলে সরকার খুব দ্রুত গতিতে সিদ্ধান্ত নেবে। অর্থাৎ ২০১৯ সালের দিকে বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের আগ্রহ রয়েছে সরকারের।

সিভিল এভিয়েশনের প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী বলেছেন, বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট হবে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার বৃহতত্তম ও আকর্ষণীয় এক স্থাপনা। এর নান্দনিক নির্মাণশৈলী হবে অভূতপূর্ব। আগামী এক শ’ বছরের পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়ে সাজানো হবে এর অবকাঠামো। এটির ব্যয় কতটা হবে সেটা অঙ্ক করে আনুমানিক ধারণা দেবে সমীক্ষা প্রতিবেদনের কাজ পাওয়া নিপ্পন কোং।

বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্টের সম্ভাব্য স্থান, নির্মাণ ব্যয়, সময়সীমা ও মডেল কেমন হতে পারে জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী বলেছেন, এ সব প্রশ্নের জবাব তৈরির কাজই দেয়া হয়েছে জাপানের শীর্ষ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান নিপ্পনকে। নিপ্পনের সমীক্ষা প্রতিবেদন যত দ্রুত পাওয়া যাবে ততো দ্রুত এ প্রকল্প আলোর মুখ দেখবে।

বিশাল এ প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় সম্পর্কে সিভিল এভিয়েশন এখনই তেমন কোন মন্তব্য করতে রাজি নয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বর্তমান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যে সব অবকাঠামোগত সুবিধা আছে-তেমন একটি এয়ারপোর্ট তৈরি করতেও কমপক্ষে ষাট হাজার কোটি টাকা লাগবে। তারপর বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট থেকে গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত বিশেষ যাতায়াত অবকাঠামো তৈরি করতেই লাগবে আরও প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা। চরজানাজাতে বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট নির্মাণ করা হলে-সেখান থেকে গুলিস্তান ও বর্তমান শাহজালাল পর্যন্ত তৈরি করা হবে উড়ন্ত সেতু, বিশেষ রেল ও অন্যান্য সড়ক। যা শুধু বঙ্গবন্ধু এয়ারর্পোর্টকেন্দ্রিকই তৈরি করা হবে। এজন্য এর আনুমানিক ব্যয় কমপক্ষে ষাট হাজার কোটি টাকা ধরেই প্রকল্পে নামতে হবে। ধাপে ধাপে করলেও এ প্রকল্পটি শেষ করতে কমপক্ষে দশ বছর সময় লাগতে পারে। প্রথম ধাপে আগামী পঁচিশ বছরের চাহিদা সামনে রেখে কাজ শুরু হলেও পরের ধাপে পঞ্চাশ বছরের চাহিদা বিবেচনায় রেখে ধাপে ধাপে এ এয়ারপোর্টের কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিপ্পন আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরুর পর এ ধরনের তথ্য উঠে আসছে।

জানা যায়, সরকারী-বেসরকারী অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় প্রথম প্রকল্প হিসেবে ২০১০ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্পে নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। পরবর্তীতে পিপিপি থেকে সরে এসে নিজস্ব অর্থায়ন ও দাতা সংস্থার সহায়তায় দেশের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক এ বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। এখন চলছে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ, যা ২০১৭ সালে শেষ হবে। প্রকল্পের স্থান নির্ধারণে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রকল্পের বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নেয় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

error: দুঃখিত কুমিল্লার বার্তার কোন কনটেন্ট কপি করা যায় না।