আমরা আহত, ক্ষুব্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত

কুমিল্লার বার্তা ডেস্ক ● আবদুল মতিন খসরুষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার রাজনৈতিক মন্তব্যে আওয়ামী লীগ ক্ষুব্ধ, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত। দলটি মনে করে, দেশের বিরোধী দলও তাদের প্রতি এতটা ‘নিষ্ঠুর’ মন্তব্য করেনি।

বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সাবেক আইন ও বিচারমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের যারা বিরোধী দল, তারাও এ রকম নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেনি।’ সাবেক আইনমন্ত্রী অবশ্য একই সঙ্গে ৩৯ দফাবিশিষ্ট আচরণবিধি প্রণয়ন এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করার বিধানের বিষয়ে ইতিবাচক অভিমত দিয়েছেন।

প্রশ্ন: সামগ্রিক রায় ও তার পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে আপনার কী মন্তব্য?
আবদুল মতিন খসরু: সুপ্রিম কোর্ট বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু এ রায়ে যেসব বিষয় আনা হয়েছে, তা মামলার মূল বিষয়বস্তু থেকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। এ রায়ে আমরা ক্ষুব্ধ, আহত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব সম্পর্কে নিষ্ঠুর, নির্দয় মন্তব্য করা হয়েছে। আমরা মনে করি, এসব বিষয় মামলার মূল বিচার্য ছিল না। এবং মূল বিচার্যের সঙ্গে এর কোনো প্রাসঙ্গিকতা ছিল না। দেশের প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে আমরা এটা কোনোভাবেই আশা করি না। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের রায় মানতে আমরা বাধ্য। কিন্তু তাই বলে এ রকম অসামঞ্জস্য বক্তব্য আমরা কোনোভাবেই আশা করিনি।

প্রশ্ন: কিন্তু রায়দানকারী অন্য বিচারকেরা প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং সামরিক শাসন আমলে প্রণীত আইনের বৈধতাকরণ বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে ভিন্নমত দিয়েছেন।
আবদুল মতিন খসরু: আমার জানামতে, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা বাদে সবাই আলাদাভাবে রায় লিখেছেন।

প্রশ্ন: কিন্তু ছয়জন বিচারকই আলাদাভাবে লিখেছেন, ২০১১ সালে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে সংবিধানের অপরিবর্তনীয় মৌলিক কাঠামো ঘোষণা করে তিন বছরের মধ্যে তা পরিবর্তন করেছেন।
আবদুল মতিন খসরু: সংসদ তার স্বীয় বিচক্ষণতায় একটি সংশোধনী এনেছে। কিন্তু অন্যান্য মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তনের যে এখতিয়ার সংসদের নেই, তা তারা করেনি। কোনো আইন যদি সংবিধানের পরিপন্থী হয়, তাহলে তা তারা বাতিল করতে পারে। কিন্তু এখানে দেখার বিষয় হলো, এটা একটা সাধারণ বিষয় ছিল না। মূল সংবিধানে থাকা একটি বিষয় ফিরিয়ে আানা হয়েছে। সুতরাং সেই বিধান সংবিধান পরিপন্থী বিবেচিত হবে কোন মানদণ্ডে? কিন্তু আমাদের এখন উদ্বেগ হলো প্রধান বিচারপতির রাজনৈতিক মন্তব্য, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক হয়েছে।

প্রশ্ন: এই রায় বা পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে আপনারা কি রিভিউ করবেন?
আবদুল মতিন খসরু: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দৃঢ়ভাবে আইনের শাসনে বিশ্বাসী। আমরা আলাপ-আলোচনা করে যথাসময়ে যথা সিদ্ধান্ত নেব। এখনো কোনো সভা ডাকা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহলে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা হবে এবং সংসদে বিস্তারিত আলোচনা করব। সংবিধানের ব্যাখ্যা বা জুডিশিয়ার রিভিউ এবং কমপ্লিট জাস্টিস দেওয়ার এখতিয়ার রাষ্ট্রের অন্য কোনো অঙ্গের নেই। এটা শুধুই সুপ্রিম কোর্টের। আর সংসদের দায়িত্ব ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করা। সংবিধনের ৯৪(২) এবং ১১৬(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারকেরা বিচারকার্যে স্বাধীন থাকবেন। আমরা বলতে চাইছি, পৃথিবীর কোনো দেশে প্রধান বিচারপতি কোনো দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্পর্কে এ রকম একতরফা মন্তব্য করেছেন কি না, তা আমাদের জানা নেই। আমরা আহত, ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষুব্ধ। ওই বক্তব্য অযাচিত ও অসমীচীন এবং তা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রশ্ন: তার মানে, সাতজন বিচারপতির মূল রায়ের প্রতি আপনি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু আপনার ভিন্নমত প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণে?
আবদুল মতিন খসরু: আমি এ রকম বলতে চাইছি না। এ রায় সম্পর্কে আপাতত কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে সাধারণভাবে সুপ্রিম কোর্টের সব রায় ও আদেশের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে।

প্রশ্ন: ছয় বিচারকই লিখেছেন, চতুর্থ সংশোধনীতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব ও সংসদের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছিল।
আবদুল মতিন খসরু: এ মন্তব্য করার এখতিয়ার বিচারকদের রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সমালোচনা করার অধিকার আমার নেই। তাঁরা যদি কোনো রায় ভুল দিয়ে থাকেন, তাহলে তা শোধরানোর এখতিয়ার তাঁদের রিভিউতে রয়েছে এবং তার অনেক নজির রয়েছে।

প্রশ্ন: নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের সম্পর্ক কোন দিকে গড়াতে পারে বলে মনে হয়?
আবদুল মতিন খসরু: বিচার বিভাগের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান কাম্য নয়। রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ—বিচার বিভাগ, আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগ। তাদের মধ্যে সম্পর্ক হবে পরিপূরক ও সম্পূরক এবং সমঝোতামূলক। প্রত্যেক স্তম্ভই তার আপন আপন বলয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করবে। কারও অধিক্ষেত্রে কেউ অনুপ্রবেশ করবে না, এটাই সংবিধানের নির্দেশ।

প্রশ্ন: প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেছেন, দুই সামরিক শাসক দেশকে ব্যানানা রিপাবলিকে পরিণত করেছিলেন।
আবদুল মতিন খসরু: তিনি সঠিক বলেছেন। বিচার বিভাগ তখন তল্পিবাহক ছিল। তাঁরা সংবিধানের ওপর সামরিক আইনের প্রাধান্য দেখেছিলেন।

প্রশ্ন: পঞ্চম ও ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ে আপনারা এবং ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে বিএনপি খুশি হয়েছে।
আবদুল মতিন খসরু: এটা কাঙ্ক্ষিত নয়। সংবিধান প্রশ্নে কোনো ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়।

প্রশ্ন: প্রধান বিচারপতি বলেছেন, আদালত বিব্রত। কারণ, দুই জবরদখলকারীর আমলের ৮১টি আইন আপনারা অবিকল গ্রহণ করেছেন।
আবদুল মতিন খসরু: এটা আমরা বাধ্য হয়ে ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে করেছি।

প্রশ্ন:  তাঁর মতে, এখনই বিচার বিভাগ অন্যান্য অঙ্গের চেয়ে ভালো অবস্থায় এবং তা-ও পানিতে নাক উঁচু করে রেখেছেন। তাঁরাও ডোবার পথে।
আবদুল মতিন খসরু: এটা তিনি ঠিকই বলেছেন।

প্রশ্ন: আপনি কি এক্সপাঞ্জ আশা করেন?
আবদুল মতিন খসরু: আমি ভীষণভাবে আশা করি। মানুষমাত্রই ভুল করতে পারেন। এটাও ওনার ভুল হয়েছে।

error: দুঃখিত কুমিল্লার বার্তার কোন কনটেন্ট কপি করা যায় না।