প্রবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ

কুমিল্লার বার্তা ডেস্ক ● বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ চালিত হয় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি শুধুমাত্র নিজ স্বজনদের জীবনমান উন্নয়নে এবং দেশীয় অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে প্রবাসীতে পরিণত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সাল থেকে বিদেশগামীদের তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় সরকার। আর ১৯৭৬ সাল থেকে এ বছরের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশের মাটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ ৯১ হাজার ১৯১ বাংলাদেশির।

মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ১৩ শতাংশ। অথচ তাদের কল্যাণে গত সাড়ে ৪ দশকেও হয়েছিল না কোন আইন প্রণয়ন; গঠন করা হয়নি কোন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অনেক দেরিতে হলেও অবশেষে প্রবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। গত ৬ নভেম্বর ‘প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড আইন ২০১৭’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। তবে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হবে ‘ওয়েজ আর্নার্স বোর্ড ২০১৭’। সভা শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড এতদিন বিধি দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। এবারে এটা আইনে পরিণত হচ্ছে।’ এই আইনে অভিবাসীদের সংজ্ঞাও নির্দিষ্ট করে দেয়া হচ্ছে।

সচিব জানান, মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়া অনুযায়ী বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে যিনি বিদেশে গেছেন অথবা বিদেশে আছেন অথবা বিদেশে কর্মরত আছেন— এমন নাগরিকদের অভিবাসী বলা হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের বাইরে অন্য কোনও দেশে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করছেন, কাজে আছেন অথবা কাজ শেষে ফিরে এসেছেন।

এমন বাংলাদেশি নাগরিকদের অভিবাসী কর্মী হিসেবে সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে এই আইনে। অভিবাসী ও অভিবাসী কর্মী উভয়েই প্রবাসী নামে পরিচিত হবেন বলে জানান সচিব।

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইনের খসড়ায় বলা আছে, বোর্ডের একটি তহবিল থাকবে। সরকারি অনুদানসহ আটটি খাত থেকে এই তহবিলের অর্থ আসবে। বোর্ডের চেয়ারম্যান জরুরি প্রয়োজনে যেকোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে তা বোর্ডের পরবর্তী সভায় অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। অনুমোদিত খসড়া অনুযায়ী এই বোর্ডে থাকবেন ১৬ জন সদস্য। পদাধিকারবলে এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হবেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব।

এই বোর্ডে অন্যান্যের মধ্যে থাকবেন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক (ডিজি) এবং অর্থ মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিমান মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ, বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেনন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন করে প্রতিনিধি।

এছাড়া, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) প্রেসিডেন্ট এবং সরকারের দুই জন প্রতিনিধি থাকবেন এই বোর্ডে। সরকারের এই দুই প্রতিনিধি হবেন বিদেশ থেকে প্রত্যাগত এবং এর মধ্যে একজন থাকবেন নারী। বহির্গমন অধ্যাদেশ-১৯৮২ বাতিল করে ২০১৩ সালে সরকার বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন প্রণয়ন করলেও প্রবাসীদের কল্যাণের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো উল্লেখ ছিল না। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসি জানান, প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের জীবনমানের উন্নয়ন ও বহুমুখী কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড নামে একটি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এ জন্যই আইন প্রণয়নের উদ্যোগ।

তিনি জানান, এটি একটি নতুন আইন। এতদিন বিধি দিয়ে চলছিল। ১৬ সদস্য বিশিষ্ট প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের মেয়াদ হবে ৩ বছর। এটিকে একটি মহতী উদ্যোগ মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, কর্মীদের দ্রুত সেবাদান ও হয়রানিমুক্ত করতে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড গঠনের মাধ্যমে এ সেবা আরও গতিশীল করা হবে।

২০১৫ সালের ১ জুন অনুষ্ঠিত ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের এক সভায় প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ‘প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড আইন’ প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আইনের খসড়ায় যা আছে: ১. যুদ্ধাবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি লে-অফ বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুরবস্থা বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতির কারণে কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান এবং ক্ষেত্রবিশেষে দেশে প্রত্যাবাসনে নিশ্চয়তা থাকছে। ২. প্রত্যাগত অভিবাসীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসন। ৩. কর্মীদের সহায়তা প্রদানে বিমানবন্দরে ডেস্ক স্থাপন ও পরিচালনা। ৪. কর্মরত কোনো অভিবাসীকর্মী নির্যাতনের শিকার, দুর্ঘটনায় আহত, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে বিপদগ্রস্ত হলে তাদের উদ্ধার, দেশে আনা এবং প্রয়োজনে আইনি সহায়তা ও চিকিৎসাসেবার নিশ্চয়তা দেওয়া।

৫. বিদেশে কর্মীর মৃত্যু বা পেশাগত কারণে অসুস্থ হলে নিয়োগকর্তার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ, বকেয়া বেতন আদায়, ইন্স্যুরেন্স ও সার্ভিস বেনিফিট আদায়ে সহায়তা ও নির্ভরশীলদের আর্থিক অনুদান প্রদান। ৬. কোনো নারীকর্মী নির্যাতনের শিকার, দুর্ঘটনায় আহত, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে বিপদগ্রস্ত হলে তাদের উদ্ধার, দেশে আনা এবং প্রয়োজনে আইনি সহায়তা ও চিকিৎসাসেবার নিশ্চয়তা দেবে সরকার।