মাঠে নেই সাক্কু; বিভ্রান্তি ও দ্বিধা-বিভক্তি বিএনপিতে

কুমিল্লার বার্তা ডেস্ক ● দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার কারাদন্ডের পর বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিভ্রান্তি ও দ্বিধা-বিভক্তি ছড়িয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়হীনতা ও অকার্যকর কর্মসূচিতে তৃণমূলে দেখা দিয়েছে হতাশা। বিভ্রান্তি ও দ্বিধা-বিভক্তি স্পষ্ট লক্ষ্য করা গেছে কুমিল্লাতেও। খালেদা জিয়ার রায়ের পর ঘোষিত দুই দিনের কর্মসুচিতে কুমিল্লায় আন্দোলনের মাঠে দেখা যায়নি অনেক নেতা কর্মিকে।

তার মধ্যে অন্যতম কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মেয়র মনিরুল হক সাক্কু। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র মনিরুল হক সাক্কু অনেকটা বিনা বাধায় বিএনপির মনোনয়ন লাভ করে দ্বিতীয়বারের মত মেয়র নির্বাচিত হন।

তবে দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার কারাদন্ডের পর দুই দিনের কর্মসুচিতে একদিনও তাকে মাঠে দেখা যায়নি। বরং রায়ের আগের দিন অর্থাৎ গত বুধবার থেকেই তিনি কুমিল্লা ছেড়ে ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানাগেছে।

তৃণমূলের এ গুরুত্বপূর্ণ নেতার এমন ভূমিকায় কর্মিদের মাঝে নান প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

এদিকে শনিবার মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন জানিয়ে মুঠোফোনে খালেদা জিয়ার রায় ও কারাদন্ড নিয়ে কোন কথা বলতে রাজি হননি।

গত বৃহস্পতিবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে বেগম খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ড হয়েছে।

তারেক রহমানসহ অন্য আসামিদের ১০ বছর করে কারাদন্ড ঘোষণা করা হয়েছে। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে তাকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদের ১০ বছরের কারাদন্ডই বহাল রাখা হয়েছে। সেইসঙ্গে অর্থদন্ড হিসেবে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে আসামিদের। উল্লেখ্য, ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই দুদক খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এ মামলাটি করে।

বিএনপি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার দন্ডাদেশের পর বিএনপিতে দ্বিধা-বিভক্তি ও ভাঙ্গনের সুর স্পষ্ট। বিতর্ক উঠে দলে এখন পাঁচ মাথা দৃশ্যমান। নেতাকর্মীরা নেতা মানছেন কেউ খালেদা জিয়াকে, কেউ তারেককে, কেউ ফখরুল, কেউবা মওদুদ আবার কেউবা রিজভীকেও। দলের ক্রান্তিকালে একতার পরিবর্তে নিজেদের আখের গোছানোর প্রবৃত্তি বিএনপিতে দেখা যাচ্ছে, যা দলের জন্য অশনি সংকেত বলছেন বিশ্লেষকরা।

বিএনপি অতীত কর্মকান্ডের জন্য এমনিতেই জনবিচ্ছিন্ন। নির্বাচনে না যাওয়ার মাশুল শেষ হবার আগেই এই অন্তর্দ্বন্দ্ব ও দলীয় কোন্দল বিএনপিকে নাকাল করছে।

খালেদা জিয়ার ভুল সিদ্ধান্ত ও নাশকতামূলক কর্মকান্ডের কারণে বিএনপি’র ভেতরে অস্থিরতা কাজ করছে। বিএনপির সাম্প্রতিক রাজনীতি, নেতাদের ঐক্য ভাঙার পথে কাজ করছে। বেগম জিয়া কারাগারে যাবার কয়েকঘণ্টার মধ্যে বিএনপিতে মত বিরোধ প্রকাশ্য আকার নিয়েছে। বিএনপির নেতারা পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন এবং বক্তব্য দিচ্ছেন। অন্যদিকে খালেদার অনুপস্থিতিতে কেউ তারেক জিয়াকে দল প্রধান মানছেন আবার অনেকেই এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে আপত্তি তুলছেন।

সূত্র মতে, এসব নিয়ে দলীয় ঘোষণায় বিভ্রান্তির ছাপ স্পষ্ট বিএনপিতে। ৭ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া রায় পরবর্তী আন্দোলনের কথা বললেও, মধ্যরাত নাগাদ রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত বিএনপির সিলপ্যাডের একটি ঘোষণায় নেতা কর্মীদের শান্ত থাকতে বলা হয়। দলীয় কমান্ডে বিভক্তি ছড়িয়ে পড়েছে বিএনপিতে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলও দিয়েছেন বিভ্রান্তিকর নির্দেশনা। দলীয় প্রধানের বিপক্ষে গিয়ে তিনি নেতা কর্মীদের ঘরে থাকার নির্দেশ দেন।

দলীয় চেয়ারপারসন ও বিএনপির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ফারাকে বিভ্রান্ত ছিল নেতা কর্মীরা। তারা রায় পর্যন্ত ও পরবর্তীতে কোন দলীয় দিক নির্দেশনা পায়নি। তাহলে কি দলে চেয়ারপারসন বিদ্বেষী মনোভাব গড়ে উঠল? বিএনপির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নিয়ে জনমনে এ প্রশ্নও উঠেছে।

সূত্র আরও জানায়, উদ্ভ্রান্ত দিকনির্দেশনার জন্যই দিকভ্রষ্ট ছিল বিএনপির কর্মীরা। একদিকে জনবিচ্ছিন্নতা, অন্যদিকে দিক নির্দেশনার অভাব বিএনপিকে দাঁড়াতেই দেয়নি ৮ তারিখে। ৯ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভ সমাবেশও ছিল বিক্ষিপ্ত। দলীয় মহাসচিব নেতা কর্মীদের ছেড়ে যখন পলায়ন করেন তখন দলের রাজনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। বায়তুল মোকাররমের সামনে তারা ৩-৫ মিনিটের বিক্ষোভ করে জিপ নিয়ে চলে যান মির্জা ফখরুল। পরবর্তীতে সেটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

এদিকে, বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বিতর্কের পালে নতুন হাওয়া দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দলের সাথে সখ্যতা গড়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চাচ্ছেন এ নেতা। সবমিলিয়ে চতুর্মুখী বিতর্কের পালে আবদ্ধ এখন বিএনপি। বারংবারের ভুল সিদ্ধান্ত দলটিকে এখন দেউলিয়া রাজনৈতিক দলে পরিণত করেছে বলে বিএনপি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।