কুমিল্লার ৪টি সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তনের আশঙ্কা

কুমিল্লার বার্তা ডেস্ক ● আগামী সংসদ নির্বাচনের জন্য অর্ধশত সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তন করে খসড়া প্রস্তুত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পুনর্বিন্যাসের খসড়ায় উপজেলা অখণ্ড রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বিদ্যমান সীমানায় যেখানে ৬২ আসনে ৩৩টি উপজেলার খণ্ডিত অংশ রয়েছে, তা ডজন খানেকের মধ্যেই নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে ৫/৭টি উপজেলার ওপর প্রভাব পড়বে।

পুনর্বিন্যাসে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আসনগুলোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। শিগগিরই কমিশন সভায় প্রস্তাবিত খসড়া অনুমোদনের পর তা গেজেট প্রকাশ করা হবে। কুমিল্লার একটি আসন নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে কমিশন। এ আসনটির ফলে পরিবর্তন আসতে পারে আশেপাশের আসনগুলোর সিমানাতেও।

শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সীমানাবিন্যাস কমিটির এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

শনিবার সরকারি ছুটির দিন সকাল ১১টায় শুরু হওয়া এই বৈঠক শেষ হয় সন্ধ্যা ৬টায়। বৈঠকে সীমানা পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে কমিশনের নিয়োগ করা পরমর্শক সাবেক যুগ্ম সচিব লুৎফর রহমান ও জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস)-এর প্রতিনিধিসহ কমিশনের কর্মকর্তারা অংশ নেন।

বৈঠকের পরে ইসির একজন কর্মকর্তা জানান, খসড়া তালিকায় শেষ মুহূর্তের কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে শিগগিরই কমিশন সভায় উত্থাপন করা হবে। সেখানে অনুমোদন পাওয়া পরেই খসড়া গেজেট আকারে প্রকাশ করে দাবি-আপত্তির জন্য আবেদন চাওয়া হবে।

যেসব এলাকার সীমানা পরিবর্তন করা হচ্ছে সেখানকার ভোটাররা এ বিষয়ে লিখিত আকারে তাদের আপত্তি কমিশনে দাখিল করতে পারবেন। ওই সব দাবি-আপত্তির ওপর শুনানির আয়োজন করবে কমিশন। শুনানির পরই তিন শ’ আসনের চূড়ান্ত সীমানা প্রকাশ করা হবে। আগামী মার্চ বা এপ্রিলের মধ্যে এসব কার্যক্রম শেষ করতে চায় কমিশন।

কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন ঘোষিত রোডম্যাপে সীমানা নির্ধারণে বিদ্যামান আইন পরিবর্তন করে নতুন আইনে সীমানা বিন্যাসের ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে শেষপর্যন্ত ইসি সেই ঘোষণা থেকে সরে এসে বিদ্যমান ‘ডিলিমিটেশন অর্ডিন্যান্স-১৯৭৬’-এর আওতায় সীমানা বিন্যাস করতে যাচ্ছে।

বিদ্যমান আইনে প্রশাসনিক অখণ্ডতার সঙ্গে জনসংখ্যাকে বিবেচনায় নেওয়া কথা বলা হলেও তা পুরোপুরি সফল হয়নি। এবারের খসড়ায় প্রশাসনিক বিন্যাসকেই গুরুত্ব দেওয়ায় উপেক্ষিত রয়ে গেছে জনসংখ্যার বিষয়টি। বর্তমানে গাজীপুরে সর্বোচ্চ একটি আসনে সাড়ে সাত লাখ ভোটার রয়েছে আবার সবচেয়ে কম পৌনে দুই লাখ ভোটার রয়েছে ঝালকাঠীর একটি আসনে।

বৈঠক শেষে সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তন সংক্রান্ত কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কশিমনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ম্যানুয়াল সিস্টেমে সীমানা বিন্যাসে একটি খসড়া প্রস্তুত করেছিল কিন্তু জিআইএস দেখে তার বেশ পরিবর্তন করতে হয়েছে। আমরা সার্বিক দিক বিবেচনা করে সীমানা নির্ধারণের কাজ এগিয়ে এনেছি। নতুন ছিটমহল যুক্ত হওয়া ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের কারণে কিছু আসনের পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এর সংখ্যা এখনই বলা যাচ্ছে না।’

কুমিল্লার একটি আসনে মামলাজনিত কারণেই তাদের সীমানা পুনর্বিন্যাস আটকে রয়েছে উল্লেখ করে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সব প্রস্তুতি থাকলেও কুমিল্লার একটি আসনের সীমানা সম্পর্কে আদালতের নির্দেশনা থাকায় আমরা এটি চূড়ান্ত করতে পারছি না। আপিলের রায় পাওয়ার পর তিনশ সংসদীয় আসনের সীমানা চূড়ান্ত করতে পারবো। তবে, মামলার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দুই ধরনের প্রস্তুতি খসড়ায় রাখা হয়েছে।’

বৈঠক সূত্র জানায়, কুমিল্লা-১০ (সদর দক্ষিণ ও লাঙ্গলকোট) আসন নিয়ে অনেক আগ থেকেই বিতর্ক ছিল। আদালতের রায় মেনে এই আসন পুনর্বিন্যাস করতে হলে কুমিল্লা-৬ (আদর্শ উত্তর), কুমিল্লা-৯ (লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ), কুমিল্লা-১০ ও কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনের বিদ্যমান সীমানা পরিবর্তন করা হবে।

আপিলের রায় কমিশনের পক্ষে এলে শুধু কুমিল্লা-১০ ও কুমিল্লা-১১ আসনের সীমানায় পরিবর্তন আসবে।

বিদ্যমান সীমানা পর্যলোচনা করে দেখা গেছে, উপজেলার অখণ্ডতা রাখা হলে দেশের ৬৩টি আসনের সীমানায় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু সংসদীয় আসনের অখণ্ডতা ধরে রাখা ও ভোটার সংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে ১০/১২টি আসনের উপজেলার অখণ্ডতা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। সেগুলোর মধ্যে যশোর-৩ ও ৪, নড়াইল-১ ও ২ এবং চুয়াডাঙ্গা-১ ও ২ ইত্যাদি। কমিটি এসব আসনের ভৌগলিক অখণ্ডতা, জনসংখ্যা ও অন্যান্য দিক বিবেচনা করে এতে পরিবর্তন না করার বিষয়ে একমত হয়েছে। আর সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড অখণ্ড রাখতে গিয়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার কয়েকটি আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। নতুন ছিটমহল যুক্ত হওয়ায় লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের কয়েকটি আসনের সীমানাও পরিবর্তন আসবে।

নির্বাচন কমিশনোর কর্মকর্তারা জানান, উপজেলা অখণ্ড রাখার কারণে অর্ধশত সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন আসতে পারে। বৈঠক সূত্র জানায়, ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকাইল উপজেলা খণ্ডিত অবস্থায় দু’টি আসনের মধ্যে রয়েছে। নতুন খসড়ায় একত্রিত করে একটি আসনে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে নীলফামারীর ৩ ও ৪ আসনে কিশোরগঞ্জ উপজেলা খণ্ডিত অবস্থায় রয়েছে। এটি এখন একত্রিত করে একটিতে আনা হচ্ছে। কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর ও চিলমারী উপজেলাও বর্তমানে খণ্ডিত রয়েছে। ঢাকার জেলার কেরানীগঞ্জ উপজেলাকে ভাগ করে ঢাকা ২ ও ৩ আসনে বর্তমানে থাকলেও এই উপজেলাকে একটি আসনে আনা হয়েছে। এছাড়া সাভার উপজেলাকে খণ্ডিত অবস্থায় ঢাকা-২, ১৪ ও ১৯ আসনে বর্তমানে থাকলেও তাকে একটি আসনে আনা হয়েছে।

একই কারণে আরও যেসব আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনা হয়েছে এরমধ্যে রয়েছে, সিরাজগঞ্জ ১ ও ২, পাবনা ১ ও ২, ঝিনাইদহ ২ ও ৪, খুলনা ৩ ও ৫, সাতক্ষীরা ৩ ও ৪, জামালপুর ৪ ও ৫, মানিকগঞ্জ ২ ও ৩, গাজীপুর ৩ ও ৫, নরসিংদী ১ ও ২, ফরিদপুর ২ ও ৪, মাদারীপুর ২ ও ৩, সিলেট ২ ও ৩, মৌলভীবাজার ২ ও ৪, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ৫ ও ৬, নোয়াখালী ১, ২ , ৪ ও ৫, লক্ষ্মীপুর ২ ও ৩, চট্টগ্রাম ৭ ও ৮, ১২ ও ১৩, ১৪ ও ১৫।