কুমিল্লার ১৫ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হলেন যারা

কুমিল্লার বার্তা ডেস্ক ● কুমিল্লার ১৫টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামীলীগ দলীয় নৌকা প্রতীকের ১৪ জন ও অপর একটিতে একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাঁরা হলেন- জেলার লাকসাম উপজেলার মুদাফ্ফরগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নে আওয়ামীলীগের মো. শহিদুল ইসলাম শাহীন (নৌকা), মুদাফ্ফরগঞ্জ দক্ষিণ আবদুর রশিদ (নৌকা), বাকই উত্তর মো. আইউব আলী (নৌকা)।

বাকই দক্ষিণ মো. আবদুল আউয়াল (নৌকা), নাঙ্গলকোট উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে আদ্রা দক্ষিণ মো. আবদুল ওহাব (নৌকা), আদ্রা উত্তর মো. তাজুল ইসলাম মজুমদার (নৌকা), বটতলী ইউনিয়নে একেএম সিরাজুল আলম (নৌকা), দৌলখাঁড় আবুল কালাম ভূঁইয়া (নৌকা), জোড্ডা পূর্ব আনোয়ার হোসেন মিয়াজী (নৌকা), জোড্ডা পশ্চিম মাসুদ রানা ভুঁইয়া (নৌকা), রায়কোট উত্তর রফিকুল ইসলাম মজুমদার (নৌকা), রায়কোট দক্ষিণ মজিবুর রহমান (নৌকা) এবং দাউদকান্দি উপজেলার বারপাড়া ইউনিয়নে মনির হোসেন তালুকদার (নৌকা), দৌলতপুর আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী মোহাম্মদ মহিনউদ্দিন চৌধুরী (ঘোড়া), ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়নে মো. মামুনুর রশিদ (নৌকা)।

এদিকে দাউদকান্দিতে ভোট কেন্দ্রের পাশ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় বিপুল সংখ্যক দেশিয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে দৌলতপুর ইউপির নোরানদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের পাশ থেকে অস্ত্রগুলি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে- চাইনিজ কোড়াল ২টি, চাপাতি ৩টি, রামদা ৩টি, হকিস্টিক ২টি, গ্যাসপাইপ ২টি, স্টিলের লাঠি ১৮, ধারালো ছেনি ৬টি ও লম্বা ছুরি ২টি।

নোরানদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুরাদনগরের বাঙ্গরাবাজার থানার উপ-পরিদর্শক নাজমুল হুদা জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে ভোটকেন্দ্রের পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় অস্ত্রগুলি উদ্ধার করা হয়। তবে এর সাথে জড়িত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

তিনি আরো বলেন, কেন্দ্র দখলের উদ্দেশে অস্ত্রগুলো এখানে মজুদ করা হয়েছে। এ ঘটনার পর ওই ইউনিয়নে বিপুল পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

এদিকে জেলার চার উপজেলার এ ১৫টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে নাঙ্গলকোট উপজেলার আদ্রা দক্ষিণ ইউনিয়নে বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন, জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী মাস্টার সাইফুল্লাহ ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী নাছির উদ্দীন মামুন নিজের ভোট দিতে পারেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। তিন চেয়ারম্যান প্রার্থী বলেন, ‘চাটিতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দিতে গিয়েছি। বহিরাগত সন্ত্রাসীরা আমাদেরকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়নি। তাই আমরা ভোট দিতে পারিনি।’

ভোট দিতে পারেননি তিন ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী
এদিকে ১৫টি ইউনিয়নে বিএনপি মনোনীত ১২ চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ ১৪ জন নির্বাচন বয়কট করেছেন। সরকার দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থীদের কেন্দ্র দখল, এজেন্টদের মারধর, জাল ভোট এবং অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে রাতেই নৌকার ব্যালেটে আগাম সিল মারার অভিযোগ এনে তারা নির্বাচন বয়কট করেন। তাদের অভিযোগ বিভিন্ন কেন্দ্রে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা নিজেই প্রকাশ্যে ভোট দিয়েছেন এবং জাল ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

নাঙ্গলকোট উপজেলায় বিএনপি মনোনীত ৮ চেয়ারম্যান প্রার্থী, জামায়াত সমর্থিত এক প্রার্থী (স্বতন্ত্র) ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীসহ ১০ জন প্রার্থী দুপুরে জেলার নাঙ্গলকোট প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। এছাড়া লাকসাম উপজেলায় তিন ও লালমাই উপজেলার এক বিএনপি প্রার্থী দুপুরে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বয়কট করেন।

ভোট বয়কট করা নাঙ্গলকোট উপজেলার ৮ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা জানান, সকাল থেকেই উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রই দখলে নেয় সরকার দলীয় নৌকার সমর্থকরা।

এর আগে রাতেই অনেক ভোট কেন্দ্রে নৌকার ব্যালটে সিল মারা হয়েছে। এছাড়া সকালে বিএনপির এজেন্টদের কেন্দ্রের গেট থেকেই বের করে দিয়ে প্রকাশ্যে নৌকার ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা হয়। বিভিন্ন কেন্দ্রে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা নিজেই প্রকাশ্যে ভোট দিয়েছেন এবং জাল ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এতে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোন ধরনের প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে চেয়ারম্যান প্রার্থীদের অভিযোগ।

ভোট বর্জনকারী চেয়ারম্যান প্রার্থীরা হলো আদ্রা দক্ষিণ ইউনিয়নের বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন, জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী (স্বতন্ত্র) মাস্টার সাইফুল্লাহ ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হাত পাখার নাছির উদ্দীন মামুন। আদ্রা উত্তর ইউনিয়নে মাহবুবা আক্তার, বড়তলী ইউনিয়নে গোলাম মাওলা, দৌলখাঁড় ইউনিয়নে মো. মোশারফ হোসেন, জোড্ডা পূর্ব ইউনিয়নে শফিকুর রহমান চৌধুরী, জোড্ডা পশ্চিম ইউনিয়নে শাহজাহান মজুমদার, রায়কোট উত্তর ইউনিয়নে মো. ইদ্রিস মিয়া এবং রায়কোট দক্ষিণ ইউনিয়নে নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ৮ ইউনিয়নের ভোট বাতিল করে পুনরায় ভোট গ্রহণের জন্য রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ৮ চেয়ারম্যান প্রার্থী।

আদ্রা দক্ষিণ ইউনিয়নের জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী মাস্টার সাইফুল্লাহ ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী নাছির উদ্দীন মামুন সকাল ১০টায় চাটিতলায় সংবাদ সম্মেলন করে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। এছাড়া লাকসাম উপজেলায় তিনটি ইউনিয়নের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী বাকই দক্ষিণ ইউনিয়নে আনোয়ার হোসেন, মুদাফরগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নে শাহ আলম, মুদাফরগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়নে মো. আবুল বাসার ও লালমাই উপজেলার বাকই উত্তর ইউনিয়নে বিএনপি প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

চাটিতলা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার ইবাল বাহার জানান, জাল ভোট এবং অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা নির্বাচন অফিসার মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘জাল ভোটের বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রসঙ্গত, কুমিল্লার নাঙ্গলকোট, লাকসাম, মুরাদনগর, দাউদকান্দি ও চান্দিনা উপজেলায় মোট ১৫টি ইউনিয়নের সাধারণ নির্বাচন ও ৪টি ওয়ার্ডের উপনির্বাচন চলছে।

বিএনপির সন্ত্রাসীদের হামলায় ৩ সাংবাদিক আহত, গাড়ি ভাংচুর, ক্যামেরা ছিনতাই
দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়নের ২৮ ডিসেম্বর ইউপি নির্বাচন চলোকালে বিএনপি সন্ত্রাসীদের হামলায় ৩ সাংবাদিক আহত, গাড়ি ভাংচুর, ক্যামেরা ছিনতাই এর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় কুমিল্লায় সাংবাদিক সমজ তীব্র নিন্দ্রা ও হামলা কারীর দ্রুত গ্রেফতারপূর্বক বিচার দাবী করেছে।

বৃহস্পতিবার নির্বাচন চলাকালে দুপুর ২টার দিকে সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়ি ভিকতলা মাদ্রাস ভোট কেনন্দ্র থেকে সংবাদ সংগহ শেষে টামটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র পদক্ষিণ কালে টামটা জামে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেয়া হয় বিএনপি সমর্থীত প্রার্থী মো: আনোয়ার হোসেনের উপর হামলা করা হয়েছে। এ ঘোষনার পর পরই স্থানীয় প্রায় শতাধিক লোক দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সাংবাদিকদের গাড়ি ভাংচুর, ক্যামেরা ছিনতাই ও মারধর করে।

খবর পেয়ে পুলিশ, র্যা ব, বিজিবি ঘটনাস্থল থেকে সাংবাদিকদের আদ্ধর করে। ঘটনায় দীপ্ত টিভির কুমিল্লা প্রতিনিধি শাকিল মোল্লা, বিজয় টিভির রিপোর্টার আলাউদ্দিন আল আজদ, ক্যামরো ম্যান জাহাঙ্গীর আলম আহত হয়। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। উক্ত হামলার ঘটনায় কুমিল্লায় কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার সাংবাদিকরা তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দ জানান।

লাকসামে বিএনপির ভোট বর্জন
এদিকে লাকসামেও বছরের শেষ তিনটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছে। অপরদিকে বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে সকাল সাড়ে ১১টা নির্বাচন বর্জন করে পূনরায় নির্বাচন দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহবান জানান।

জাল ভোট দেওয়ার অপরাধে ভ্রাম্যমান আদালত ১জনকে গ্রেফতার করে। ভোট কেন্দ্রেগুলোর মেম্বার প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে ১০জন আহত হয়েছে। বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে সকাল থেকে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যনীয়। অনেক কেন্দ্রে পুরুষ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল অনেক কম।

বাকই ইউনিয়নের দক্ষিণ গাজিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে জাল ভোট দেওয়ার অপরাধে ভ্রাম্যমান আদালতের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট রাসেল (২৫) নামের এক যুবককে গ্রেফতার করে। ওই কেন্দ্রে মেম্বার প্রার্থী মোরগ ও ফুটবল মার্কার সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে ১০জন গুরুতর আহত হয়।

আহতদের মধ্যে ফরহাদ (৩০), মোজাম্মেল (২৫), জাহাঙ্গীর (৩০), নুরুল ইসলাম (২৮) ও আক্তার হোসেন (৪৫) আহত হয়। আহত অবস্থায় তিনজনকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মুদাফ্ফরগঞ্জ (উত্তর) ইউনিয়নের আবদুল মান্নান, আবদুর রশিদ আহত হয়। অপরদিকে সকাল সাড়ে ১১টা বিএনপির চারটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও মেম্বার প্রার্থীরা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক আবুল কালামের বাড়িতে উপজেলা বিএনপির ব্যানারে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

ওই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি রফিকুল ইসলাম।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, মধ্যরাত থেকে বিক্ষিপ্ত বোমাবাজী, তিনটি ইউনিয়নে প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে এজেন্টদেরকে ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এছাড়া তিনি আরো বলেন বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দিয়ে আমাদের বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদেরকে ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দেয় এবং তিনস্থরের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ভোট জালিয়তি করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীদেরকে বারবার অভিযোগ দেওয়ার পরও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

মুদাফ্ফরগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের বিএনপি প্রার্থী শাহ আলম অভিযোগ করে বলেন, বুধবার রাতে লাকসাম থানা পুলিশ আমার বাড়ি থেকে মীর হোসেন তার অফিস স্টাফ ও আহসান উল্লাহকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, সিনিয়র যুগ্ন-সম্পাদক কাজী আবদুর রশিদ, উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন, উপজেলা বিএনপি নেতা মোঃ সিরাজুল ইসলাম ও মনির আহমেদসহ প্রমুখ।