নেট বোলার থেকে জাতীয় দলে কুমিল্লার মেহেদী

কুমিল্লার বার্তা ডেস্ক ● বাড়ির পাশেই শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম, যেখানে প্রতিনিয়ত ব্যাট-বলের লড়াই চলে হাজারো তরুণের। ব্যাট-বলের সেই শব্দের মোহে পড়ে চলে আসেন স্টেডিয়ামে। টেনিস বলে অলিগলিতে টুকটাক খেলার অভ্যাস থাকলেও ক্রিকেট বলে খেলা তো দূরে থাক- প্র্যাকটিসও করা হয়নি। তাতে কী! এই তরুণের একটি সময়ে নেটে বল করার সুযোগ হয়।

এর পর খুলনার আবু নাসের স্টেডিয়ামকে নিজেদের বাড়ির উঠোন বানিয়ে ফেলেন এই তরুণ। সেই নেট বোলার মেহেদী হাসান এখন জাতীয় দলে খেলার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

আসন্ন ত্রিদেশীয় সিরিজ ও শ্রীলংকার বিপক্ষে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ সামনে রেখে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ঘোষিত ৩২ সদস্যের দলে ডাক পেয়েছেন মেহেদী হাসান।আগামীর সম্ভাবনাময়ী এই তরুণ কথা বলেছেন ক্রিকেট নিয়ে তার স্বপ্ন ও নিজের ক্রিকেটার হয়ে ওঠা। তার সেই সাক্ষাৎকারটি আমাদের অনলাইনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল।

প্রশ্ন : অভিনন্দন আপনাকে, জাতীয় দলের প্রাথমিক স্কোয়াড়ে সুযোগ পেয়েছেন। দেশের হয়ে খেলার অপেক্ষায়…?
মেহেদী হাসান : ছোটকাল থেকে যতই কষ্ট করেছি, সেটি জাতীয় দলে খেলার জন্য। এই প্রথম জাতীয় দলের স্কোয়াডে সুযোগ পেয়েছি। প্রাথমিক দলে ডাক পেয়েছি, আশা আছে মেইন টিমে থাকব। সব কিছু নির্ভর করবে টিম ম্যানেজমেন্টের ওপর। আমি আমার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।

প্রশ্ন : আপনার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্প যদি বলেন?
মেহেদী হাসান : বেসিক্যালি আমার বাড়ির পাশেই শেখ আবু নাসের আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম। একদম বাড়ির পাশেই স্টেডিয়ামটা। ধরতে গেলে পৈতৃক সম্পত্তির ওপর স্টেডিয়ামটা। ছোটকাল থেকে মাঠ ফাঁকা থাকত, ওইভাবে খেলতে খেলতে মাঠটা যখন আন্তর্জাতিক মর্যাদা পায়, তার আগ থেকেই ক্রিকেট অনেকে খেলতে আসত। ওইভাবে দেখতে দেখতেই শুরু।

প্রশ্ন : এই দেখতে দেখতেই কি ক্রিকেট খেলায় জড়িয়ে যাওয়া?
মেহেদী হাসান : আসলে ২০০৫ সালে আবু নাসের স্টেডিয়ামে খুলনা বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৫ দলের একটা ক্যাম্প হচ্ছিল। তখন আমি নেটে বল করার সুযোগ পাই। পরের বছর খুলনায় আরব আমিরাত এবং বাংলাদেশ ‘এ’ দলের একটা সিরিজ হচ্ছিল। আমি নেটে অনেক বোলারের বোলিং স্টাইল নকল করতে পারতাম। সেই সময় আরব আমিরাত দলের কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে, আমার বোলিং দেখে আমাকে অনেক পছন্দ করছিল।

তখন উনি আমায় বলছিলেন- তোমার কী লাগবে? আমি বলেছি- একটা ব্যাট আর একটা বল লাগবে। তখন উনি আমাকে একটা বল আর ব্যাট উপহার দেন। ওই সময় বাংলাদেশের আম্পায়ার সোহেল ভাই দুবাই টিমের সঙ্গে দোভাষী হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি আমাদের খুলনার কোচ শেখ সালাহউদ্দিনের মাধ্যমে আমাকে হাথুরুসিংহের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

প্রশ্ন: কার হাত ধরে আপনার ক্রিকেটার হয়ে ওঠা?
মেহেদী হাসান : আমার ক্রিকেটার হয়ে ওঠা কোচ শেখ সালাহউদ্দিনের হাত ধরে। তিনি অবশ্য মারা গেছেন। উনার মাধ্যমে আমার ক্রিকেট খেলা শুরু। এর পর থেকে অনূর্ধ্ব-১৪, ১৫ ও ১৭ ন্যাশনাল স্কোয়াডেই থাকতাম। এখানে খেলার পর অনূর্ধ্ব-১৯ দলেও ছিলাম। তবে যুবদলে কখনও ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়নি। ২০১০ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ খেলার পর ২০১১ সালে যুবদলে ডাক পেয়েছিলাম। তখন প্রাথমিক দলে ডাক পেয়েছিলাম। সেখান থেকে বাদ পড়ে যাই।

প্রশ্ন : যদি বলি ক্রিকেটে আপনার হাতেখড়ি…?
মেহেদী হাসান : আমার লাইফে তিনজন কোচ পেয়েছি। তিনজনের নামই সালাহউদ্দিন। শেখ সালাউদ্দিনের হাত ধরে ক্রিকেট শুরু। ক্যারিয়ারের মাঝখানে আমাকে পথ দেখিয়েছেন সালাউদ্দিন আহমেদ। এখন যার অধীনে আছি তার নাম মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। আমি অনেক লাকি যে, তিনজন ভালো মানুষ, ভালোমানের কোচের অধীনে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আসলে তারা যে এত ভালো মানুষ, তাদের সঙ্গে কাজ না করলে বোঝা যায় না।

প্রশ্ন : অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছেন?
মেহেদী হাসান : ২০১১ ও ১০১৪ সালে আমি যুবদলে ছিলাম। এমনকি ২০১৬ সালেও আমাকে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ডেকেছিল। তখন আমি ওভারেজ হয়েছিলাম। আমার ব্যাসমেট আছে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, তাসকিন আহমেদ, লিটন কুমার দাস, জুবায়ের হোসেন লিখন, আবু হায়দার রনি। আমরা একই ব্যাসে ছিলাম।

প্রশ্ন : আপনার সঙ্গে যুবদলে খেলা অনেকেই এখন জাতীয় দলের অপরিহার্য অংশ। অথচ আপনি সুযোগ পাননি। এটি নিয়ে নিজের মধ্যে হতাশা কাজ করে না?
মেহেদী হাসান : না না, এ রকম হতাশা কখনই কাজ করে না।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ারের শুরুতে আপনি তো অফস্পিন করতেন। অথচ এখন পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান। এ নিয়ে যদি বলেন?
মেহেদী হাসান : আমি যখন ক্রিকেট খেলা শুরু করি, তখন বোলার হিসেবে শুরু করি। অনূর্ধ্ব-১৯ দলে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী যেসব বোলার ছিল, তারা অনেক ভালো ব্যাটিংও করত। তারা মেইনলি ব্যাটসম্যান ছিল। মোসাদ্দেক, আল-আমিন অনেক ভালো ব্যাটিং করত। আমি শুধু অফস্পিনার ছিলাম। তখন আমার চিন্তা ছিল- বিভাগীয় দলে বোলিংয়ের পাশাপাশি ভালো ব্যাটিং করতে পারলে ভালো জায়গা যেতে পারব। ২০১২ সালের দিকে আমি ব্যাটিং নিয়ে অনেক কাজ করা শুরু করি। খুলনার সালাউদ্দিন আহমেদ উজ্জল ভাই, উনি আমাকে ব্যাটসম্যান হওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। ব্যাটসম্যান হওয়ার সুযোগটা উনিই আমায় করে দিয়েছেন। উনি সবসময় বড় বড় টিম করতেন। উনি যে টিমই করতেন, সেই দল চ্যাম্পিয়ন হতো। তিনি আমাকে টপঅর্ডার ব্যাটসম্যান বানিয়ে ফেলেন।

২০১৪ সালে প্রথম বিভাগে গাজী ট্যাংকের হয়ে আমি ৮৫০ রান করি। যেই দলটা প্রথম বিভাগ থেকে এখন প্রিমিয়ারে খেলছে। সালাউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে তিন বছর আমি ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলি।

প্রথম বিভাগে ভালো করায় জাতীয় লিগে খুলনার দলে আমার কল আসে। ২০১৫ সালে বিশ্বকাপের সময় খুলনা আমাকে ১৮ জনের স্কোয়াডে রাখে। প্রথম তিন ম্যাচে আমার খেলার সুযোগ হয়নি। চতুর্থ ম্যাচ থেকে আমার খেলা শুরু। জাতীয় লিগের অভিষেক ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ৫০ করি। এর পরের ইনিংসেও ৫০। আমার তৃতীয় ইনিংসে ১৪০ করি। ২০১৬ সালে প্রিমিয়ার লিগে গাজী ট্যাংকের কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের অধীনে খেলি। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের অভিষেক ম্যাচে ১০০ মারি। শুরুটা ভালো হলেও মৌসুমটা ভালো কাটেনি। তবে বোলিংটা আমি অনেক ভালো করি। দলের হয়ে এক নম্বর ইকোনোমি বোলিং করি। তখন সালাউদ্দিন স্যার আমাকে নিয়ে অনেক কাজ করেন।

প্রশ্ন : ক্রিকেট ছাড়া অন্য কোন খেলা আপনার পছন্দ?
মেহেদী হাসান : আমার পছন্দের খেলা ক্রিকেট। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলেছি, স্বপ্নও ছিল ক্রিকেটার হওয়ার। তবে এখন আমি অনেক ফুটবলও খেলি। ৭-৮ বছর বয়স থেকেই পাকিস্তানের অলরাউন্ডার শহিদ আফ্রিদির ভক্ত। আফ্রিদির কারণে পাকিস্তান টিমের অনেক বড় ফ্যান ছিলাম।

প্রশ্ন : পরিবার থেকে খেলাধুলার জন্য উৎসাহ পেয়েছেন?
মেহেদী হাসান : আমার পরিবারের কেউ খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত ছিল না, এখনও নেই। পরিবার থেকে পড়াশোনার জন্যই বেশি চাপ দিত। তবে আমি পড়াশোনা করতাম না। স্কুল পালিয়ে বেড়াতাম। স্কুল ফাঁকি মারতাম। বৃহস্পতিবার স্কুলে খেলা হতো। খেলার জন্যই মূলত বৃহস্পতিবার স্কুলে যেতাম। তখন স্যাররা আমাকে বলত, খেলার দিন শুধু স্কুল আসো। অন্যদিন আসো না। খেলার জন্য অনেক বকাঝকা খেতে হয়েছে। বাসা থেকে খেলার জন্য অনুমতি দিত না। তবে যখন ভালোভাবে খেলা শুরু করেছি। তখন আর বাঁধা দেয়নি। আমার বাবা একজন ড্রাইভার ছিলেন। এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। মধ্যবৃত্ত পরিবারের সন্তান আমি। যে কারণে পরিবার চায়নি আমি পড়াশোনায় ফাঁকি দিই।

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে পরিবার থেকে উৎসাহ পাইনি। তবে আমার বাড়ির পাশেই ছিল মানজারুল ইসলাম রানার বাসা।

যখন আমি অনূর্ধ্ব-১৪/১৫ দলের হয়ে খেলা শুরু করি, তখন রানা ভাইকে দেখে বাড়তি উৎসাহ পেতাম যে, আমার বাড়ির পাশের রানা ভাই জাতীয় দলে আছে। তবে ওরকম কখনই চিন্তা করিনি, ভালো খেলোয়াড় হতে পারবো। জাতীয় দলে খেলব।

প্রশ্ন : কখন থেকে মনে হল ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে নেয়া যায়?
মেহেদী হাসান : গত দু-তিন বছর থেকে যখন আমি ভালোভাবে খেলা শুরু করি, তখন থেকে মনে হয়েছে ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে নেয়া যায়। তখন থেকেই নিজেকে মোটিভেট করছি যে, এখানে ভালো কিছু করতে পারলে ক্যারিয়ার আছে।

প্রশ্ন : জাতীয় দলের আওতায় চলে আসার পেছনে কোন জিনিসটা কাজে দিয়েছে?
মেহেদী হাসান : জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পেছনে আমার সাম্প্রতিক ব্যাটিং ও বোলিং পারফরম্যান্স অনেক কাজে দিয়েছে। বিশেষ করে সালাউদ্দিন স্যার আমাকে নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। উনি বলেন- জাতীয় দলে খেলতে হলে বোলার হিসেবেই সুযোগ পেতে হবে। উনি সব সময় বলতেন, ব্যাটসম্যান হিসেবে জাতীয় দলে আমার খেলাটা নাকি কঠিন (হাসি)।

প্রশ্ন : জাতীয় দলে সুযোগ পেলে কোন জিনিসটা রোল প্লে করতে চান?
মেহেদী হাসান : আমি যখন বয়সভিত্তিক দলে খেলেছি, তখন অলরাউন্ডার হিসেবেই খেলেছি। পরের চার বছর আমি বোলিংয়ে তেমন ফোকাস দিইনি। সর্বশেষ চার বছরে আমি অনেক ১০০ মেরেছি। ২০১০ থেকে এ পর্যন্ত আমার মনে হয় ১০টি সেঞ্চুরি মেরেছি। এখান থেকে আমার ভাগ্য ঘুরে গেছে। আবার বোলিংয়ে কামব্যাক করেছি। জাতীয় দলে সুযোগ পেলে নিজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স করতে চাই।

প্রশ্ন : দেশ ও দেশের বাইরের কাকে আপনি অনুসরণ করেন?
মেহেদী হাসান : আসলে কাউকে ফলো করে তো আর তার মতো হওয়া যাবে না। তবে দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সাকিব আল হাসানকে আমার খুব ভালো লাগে। তার বোলিং খুব ভালো লাগে। সবসময় আমি ওনার বোলিং দেখি। বিদেশে যদি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটার এবি ডি ভিলিয়ার্স, পাকিস্তানের উমর আকমলকে ভালো লাগে। বিশেষ করে গেইলের কথা না বললেই নয়। যারা একটু বেশি মেরে খেলে তাদের ভালো লাগে।