কুমিল্লা নগরীতে অটোরিকশা বন্ধ; স্থায়ী সমাধানের দাবি

কুমিল্লার বার্তা ডেস্ক ● কুমিল্লা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে কুমিল্লা জেলা পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১৪ ডিসেম্বর) সকাল থেকে কুমিল্লা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. শাহ আবিদ হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন।

পুলিশ সুপার জানান, কুমিল্লা নগরীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত আজ নগরীতে মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে নগরীর পুলিশ লাইন থেকে কান্দিরপাড় সড়ক, পুলিশ লাইন থেকে আদালত, আদালত থেকে কান্দিরপাড়, সালাউদ্দিন থেকে কান্দিরপাড়, রাণীর বাজার থেকে কান্দিরপাড়, রাজগঞ্জ থেকে কান্দিরপাড় এসব এলাকাগুলোতে লাইসেন্সবিহীন ব্যাটারিচালিত অটোবাইক চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়ার পরও যদি বন্ধ না হয়, পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অভাব পূরণে বিআরটিএ ও সিটি করপোরেশন নগরবাসীর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে আমি মনে করি।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপ বড়ুয়া বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের কারণে সাময়িকভাবে নগরবাসী একটু সমস্যার সম্মখিন হবেন। তবে তা আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ অন্যান্য পরিবহন যদি বাড়তি ভাড়া নেয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নগরীতে সিটি সার্ভিস চালুর ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের একটি চিন্তা রয়েছে বলে তিনি জানান।

এদিকে কুমিল্লা নগরীতে বেড়েছে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা আতঙ্ক। দিন দিন হিংস্র হয়ে উঠেছে এই সব অবৈধ পরিবহনগুলো। নিয়ন্ত্রণ না থাকায় প্রয়োজনের তুলনায় এর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারগুণ। এতে করে নগরবাসী ও পথচারীরা হাটা-চলায় বাধাগ্রস্ত এবং যাত্রীরা দৈনিক দুর্ঘটনার সম্মুখিন হতে হচ্ছে। এতে করে কুমিল্লা নগর জুড়ে নগরবাসীদের মনে ও জনজীবনে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার চালক অশিক্ষিত ও অনাভিজ্ঞ, পরিবহন প্রয়োজনের তুলনায় ভারসাম্যহীন এবং নিয়ন্ত্রণহীন গতির কারণে নগরীতে প্রায় দুর্ঘনার ঘটনা ঘটে আসছে।

কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন ও অটোরিকশা মালিক সমিতির সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সাল থেকে কুমিল্লা নগরীতে ৪/৫শ টি পল্লী বাইক (ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা) নামে যাত্রী পরিবহনটি যাত্রা শুরু করে। তখন কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন পৌরসভা রূপে ছিল। ৪/৫শ টি পল্লী বাইকের (ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা) মধ্যে তখনকার পৌরসভার মেয়র মনিরুল হক সাক্কু ৩ শটি পল্লী বাইককে (ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা) লাইসেন্স দিয়েছিলেন। বাকী ২শ পরিবহন অবৈধ রূপে নগরীতে চলাচল করেছি। এরপর এই পরিবহনের লাইসেন্স সংখ্যা না বাড়লেও দিন দিন বেড়েছে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার সংখ্যা। ২০১৩ সালে কুমিল্লায় নতুন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে মেয়র মনিরুল হক সাক্কু ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার লাইসেন্স বাতিল করে। তখন ওই পরিবহনের পরিমান ছিল প্রায় সাড়ে ৩ হাজার।

২০১৩ সালের পর সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসক, জেলা প্রশাসন ও কোন ধরণের সংগঠন ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণ না করায় দিন দিন অবৈধ হারে বাড়তে থাকে। যার ফলে বর্তমান ২০১৭ সালের শেষ দিকে এসে এর পরিমাণ দাড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার। তবে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশান ও অটোরিকশা মালিক সমিতি জানায় কুমিল্লা নগরীতে যাত্রী চলাচলের জন্য দেড় থেকে ২ হাজার লাইসেন্সকৃত ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার প্রয়োজন।

সাপ্তাহিক আমোদ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বাকীন রাব্বী বলেন, সুশাসনের অভাবে কুমিল্লা মহানগর জুড়ে নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার পরিমাণ বেড়েছে। নিয়ন্ত্রণহীন এই পরিবহনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসনের সুদৃষ্টি প্রয়োজন।

দুর্ঘটনা ও পরিবহনের পরিমাণ বাড়ার কারণ জানতে চাইলে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ বাবুল বলেন, আমার আওতাধীন ৩শটি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা রয়েছে। নগরীতে প্রয়োজনের তুলনায় সাতগুণ ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা রয়েছে। এটার নিয়ন্ত্রণ আমরাও চাই। নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা তৈরির কারখানা ও শো-রুম বন্ধ ঘোষণা করতে হবে।

এ ব্যাপারে কুমিল্লা ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আহম্মদ নূর বলেন, কুমিল্লা মহানগর জুড়ে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। কুমিল্লা ট্রাফিক বিভাগ কয়েকদিন পর পর অভিযান করে আটক ও জরিমানা করা হয়। আমাদের অভিযান প্রতিদিনই চলছে। অভিযানের পর ৭/১০দিন আটক রেখে ছেড়ে দেওয়া। এটা ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থায়ী কোন সমাধান নেই। নগরীতে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা স্থায়ী ভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসক, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং তাদের মালিক সমিতি বসে সিদ্ধান্তে আসতে হবে। এছাড়া নগরীতে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা স্থায়ী ভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপ বড়–য়া বলেন, নগরীতে চলাচলকৃত ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা অবৈধ ও নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে চলছে। কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনকে সকলে মিলে সহযোগীতা করলে নগরীতে এই অবৈধ ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা বন্ধ করা সম্ভব। সিটি কর্পোরেশন যতটুকু জানে এই পরিবহনটি কোন সংগঠন, রাজনীতি, জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রশাসন কারো নিয়ন্ত্রণে নেই। যে যার ইচ্ছে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা নামে পরিবহনটি রাস্তায় নামাচ্ছে। সিটি কর্পোরেশনও এর নিয়ন্ত্রণ চায়।

নগরীতে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চলাচল সম্পর্কে জানতে চাইলে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু বলেন, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন হওয়ার পর থেকে আমরা কোন ধরনের ব্যাটারি চালিত অটোরিকশাকে লাইসেন্স দিনাই। নগরীতে যানজট সৃষ্টি’র মূলক কারণ নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা। চাহিদার তুলনায় নগরীতে এই অবৈধ পরিবহনটি অতিরিক্ত হওয়ায় নগরবাসী রাস্তায় বের হলেই সমস্যায় পড়ছে। এই অবৈধ পরিবহনটিকে নিয়ন্ত্রণতে আনতে স্থানীয় এমপি মহাদয়কে সাথে নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি বসবো এবং এর একটি স্থায়ী সমাধান করা হবে বলে তিনি জানান।