কি দিয়ে গেল বিপিএল?

কুমিল্লার বার্তা ডেস্ক ● বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) পঞ্চম আসর শেষ। ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে চললো ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রায় ৪০ দিনের এই টুর্নামেন্টে হলো মোট ৪৬টি ম্যাচ। মার-মার, কাট-কাট ব্যাটিং, বোলারদের বুদ্ধিদীপ্ত বিধ্বংসী বোলিং- পুরো বিপিএলেই বুঁধ হয়ে থেকেছে সারাদেশের ক্রিকেটপ্রেমী মানুষ। সিলেট থেকে শুরু হয়ে ঢাকা, এরপর চট্টগ্রাম। সর্বশেষ ঢাকায় ফিরে শেষ হলো বিপিএলের জমজমাট এই আসর।

প্রতিটি আসর কোনো না কোনো বার্তা নিয়ে হাজির হয়। দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে জমজমাট এই আসর শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এখান থেকে প্রাপ্তি কী বাংলাদেশ ক্রিকেটের! আইপিএল যেমন প্রতিটি আসরেই একঝাঁক উদীয়মান ক্রিকেটার উপহার দেয় ভারতকে। যাদের ওপর ভর করে ভারত আজ ক্রিকেট বিশ্বে অন্যতম সেরা শক্তিশালী একটি দেশ। ভারতের বর্তমান নিয়মিত অধিনায়ক বিরাট কোহলিও কিন্তু বলতে গেলে আইপিএলেরই আবিস্কার।

তেমনই এত জাঁকজমক নিয়ে, বিপুল পরিমানে টাকা খরচ করে আয়োজিত বিপিএল থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রাপ্তি কী হলো? টুর্নামেন্ট শেষে এখন এটাই হিসাব-নিকাশ করার পালা। যদিও এবারের আসর শুরুর আগেই ঘরোয়া ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল আয়োজক কর্তৃপক্ষ। যেকানে চারজন বিদেশি খেলানোর নিয়ম ছিল এতদিন, সেখানে এবার খেলানোর নিয়ম করা হয় ৫জন করে বিদেশি। অত্যন্ত যৌক্তিক যুক্তি তৈরি ছিল আয়োজকদের কাছে, ‘টুর্নামেন্টকে আকর্ষণীয় করে তোলা।’

‘আকর্ষণীয় করে তোলা’ই যদি মানদণ্ড হয়, তাহলে এখানে ৫ জন কেন, ভবিষ্যতে আরও বেশি বিদেশি ক্রিকেটার খেলানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ, এবারের বিপিএলে তো সর্বাংশে বিদেশিরাই সেরা পারফরমার। দেশি দু-একজন ছাড়া। কিন্তু দেশের ক্রিকেটের উন্নয়নের বিষয়টি যদি মাথায় আনা হয়, তাহলে বিদেশিদের আধিক্য কমিয়ে স্থানীয় ক্রিকেটারদের বেশি সুযোগ দেয়াই ছিল সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।

তবুও প্রতিটি দলে তো ৬ জন করে দেশি ক্রিকেটার খেলার সুযোগ পেয়েছেন! এর মধ্যেও বিপিএলের প্রাপ্তির হিসাব খুব বেশি সমৃদ্ধ নয়। তবে একেবারে শূন্যও নয়।

যেমন যদি ধরা হয় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের তরুণ অফ স্পিনার মেহেদী হাসানের কথা। তাহলে কিন্তু সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন- এবারের বিপিএলে বালাদেশ ক্রিকেটে অন্যতম বড় আবিস্কার হচ্ছেন ২৩ বছর বয়সী এই তরুণ ক্রিকেটার। এবারের বিপিএলে কঠিন এক পরীক্ষার মধ্য দিয়েই খেলতে নামতে হয়েছিল তাকে।

পরীক্ষাটা ছিল ক্রিস গেইল এবং ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। এই দুই বিধ্বংসী ব্যাটসম্যানের সামনেই বিপিএল অভিষেক হয়েছিল আনকোরা এই অফ স্পিনারের।

কুমিল্লার কোচ সালাউদ্দিন আগেরদিন রাতেই যখন তাকে পরেরদিন একাদশে রাখার কথা জানিয়েছিলেন, সেই রাতে নাকি মেহেদী হাসানের ঘুমই আসেনি। পরের দিন খেলতে নেমে কী আশ্চর্য! তামিম প্রথম ওভার করার জন্য তার হাতেই বল তুলে দিলেন। আস্থার প্রতিদান রেখে শুরুতেই গেইলের বিপক্ষে জোরালো আবেদন তোলেন। আম্পায়ারের কৃপায় বেঁচে যান গেইল। কিন্তু ম্যাককালামকে ঠিকই তুলে নিলেন মেহেদী। এরপর বোল্ড করলেন শাহরিয়ার নাফীসকে। ৪ ওভারে ১৫ রান দিয়ে ২ উইকেট নিয়ে তিনিই হলেন ম্যাচ সেরা।

সেই মেহেদী হাসান আবারও রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে হলেন খড়গহস্ত। রংপুরের টপ অর্ডারে একাই ধ্বস নামান তিনি। ওপেনার জিয়াউর রহমান, ক্রিস গেইল, ওয়ানডাউনে ব্রেন্ডন ম্যাককালামকে ফিরিয়ে দেন তিনি। এরপর নাহিদুল ইসলামকে ফিরিয়ে দেন বোল্ড করে।

২২ রান দিয়ে নিলেন ৪ উইকেট। তার কাছেই মূলতঃ হেরে গিয়েছিল রংপুর রাইডার্স। ম্যাচ সেরার পুরস্কারও উঠলো মেহেদীর হাতে। যদিও ১০ ম্যাচ খেলে তার ঝুলিতে জমা পড়েছে ১০ উইকেট।

ওই ম্যাচের পরই কুমিল্লার অধিনায়ক তামিম ইকবাল বাংলাদেশের ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে আহ্বান জানান মেহেদী হাসানের যত্ন নিতে। সঠিক পরিচর্যা পেলে তিনি এক সময় পরিণত হবেন বাংলাদেশের অন্যতম একটি সম্পদে।

বিপিএলের আকিস্কারের খাতায় যদি নাম আসে, তাহলে আফিফ হোসেন ধ্রুব কিংবা জাকির হাসানের নামও তোলা যায়। আফিফ হোসেন ধ্রুব মূলতঃ গত বিপিএলের আবিস্কার। গতবার ঢাকার বিপক্ষে রাজশাহীর হয়ে খেলতে নেমেই বাজিমাত করেছিলেন তিনি। ২১ রান দিয়ে নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। এবার খেলেছেন খুলনা টাইটান্সের হয়ে। বল হাতে সেই ধ্রুবর দেখা এবারও মিলেছে। তবে উইকেট বেশি নিয়ে নয়, কৃপণ বোলিং করে। রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে মাত্র ২ ওভার বোলিং করে দিয়েছিলেন ৪ রান। উইকেট নিয়েছেন দুটি। ইকনোমি রেট ২ করে।

তবে ব্যাট হাতেও এবার ধ্রুব নিজেকে ছিনিয়েছেন। অথ্যাৎ তিনি যে একজন অলরাউন্ডার- তার প্রমাণ মিলেছে এবার। রাজশাহী কিংসের বিপক্ষে তার ব্যাটেই জিতেছিল একবার খুলনা টাইটান্স। ৩৮ বল খেলে করেছিলেন অপরাজিত ৫৪ রান। তার ওই ইনিংসে কোনো বাউন্ডারির মার নেই। ৫টি ছিল ছক্কার মার। ১৯ বছর এখনও হয়নি। এতটুকুন ছেলের বুকে কী অমিত সাহস!

নিজেকে হারিয়ে এবারের আসরে মোটামুটি ফিরে পেয়েছেন জাকির হাসান। অনুর্ধ্ব-১৯ দলে মেহেদী হাসান মিরাজের সতীর্থ ছিলেন। কিন্তু মাঝে ২ বছর কেন যেন নিজেকে চেনাতেই পারেননি। অবশেষে জাকির হাসান রাজশাহী কিংসের হয়ে এবারের আসরে সিলেট সিক্সার্সের বিপক্ষে খেললেন অপরাজিত ৫১ রানের দারুণ এক ইনিংস। তার ব্যাটেই ওই ম্যাচে জয় পেয়েছিল রাজশাহী।

২০১৫ বিপিএলের আবিস্কার ছিলেন পেসার আবু হায়দার রনি। যদিও পরেরবার (২০১৬ সালে) খুব একটা ভালো করতে পারেননি তিনি। এবার ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে নিয়মিতই উইকেট পেয়েছেন তিনি।

ঢাকার ফাইনালে উঠে আসার পেছনে রনির পেস বোলিংয়ের অবদান মোটেও কম নয়। ১২ ম্যাচে তিনি নিয়েছেন ১৫ উইকেট। এছাড়া খুলনার আবু জায়েদ রাহী গতবারের মত এবারও দারুণ বোলিং করেছেন। নিয়মিত পারফরমার ছিলেন তিনি। ১২ ম্যাচে তিনি নিয়েছেন ১৮ উইকেট। উইকেট শিকারে তিনি রয়েছেন দ্বিতীয় স্থানে। ২১ উইকেট নিয়ে তো শীর্ষেই রইলেন সাকিব আল হাসান।

কুমিল্লার সাইফউদ্দিন ইতিমধ্যেই জাতীয় দলে খেলে ফেলেছেন। আগেই নিজের জাত ছিনিয়েছেন। এবারের বিপিএলে আরও বেশি চেনালেন। কুমিল্লার প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন তরুণ এই পেসার। টুর্নামেন্টে মোট ১৬ উইকেট নিয়েছেন তিনি।