কুমিল্লাই ‘চ্যাম্পিয়ন’

কুমিল্লার বার্তা ডেস্ক ● রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে ৩৬ রানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। বিপিএলের পঞ্চম আসরে তৃতীয় হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো তৃতীয় আসরের চ্যাম্পিয়নদের। পুরো টুর্নামেন্টেই দারুণ ছন্দময় ক্রিকেট উপহার দিয়েছে কুমিল্লা। লিগ পর্বে ১২ ম্যাচের ৯টিতে জিতে ১৮ পয়েন্ট নিয়ে সবার উপরে ছিল কুমিল্লা।

সবকিছু মিলিয়ে রংপু্রের বিপক্ষে হেরে ফাইনালে যেতে না পারলেও নিজেদেরই চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখছেন কুমিল্লা অধিনায়ক তামিম ইকবাল।

মাঠের ক্রিকেটের পাশাপাশি মাঠের বাইরেও বেশকিছু সিদ্ধান্তে দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছে কুমিল্লা। চট্টগ্রামে লিগ পর্বের শেষ ম্যাচে রানআউট হওয়া কেভন কুপারকে ফিরিয়ে প্রংশসা কুড়িয়েছিলেন তামিম ইকবাল। এছাড়া টুর্নামেন্টের বাইলজ অনুযায়ী প্লে অফের কোনও ম্যাচ বৃষ্টির কারণে বাতিল হলে পয়েন্ট টেবিলে এগিয়ে থাকা দলই সরাসরি উঠে যাবে- রবিবার এ ব্যাপারে অনেক নাটকের পর শেষ পর্যন্ত পুরো ম্যাচ খেলেই ঠিক হয়েছে টুর্নামেন্টের ফাইনালের আরেক দল।

কুমিল্লা-রংপুর ম্যাচে আম্পায়ারিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন তারা

এত কিছুর পর তামিম ইকবাল কুমিল্লাকেই চ্যাম্পিয়ন মনে করছেন। সংবাদসম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘দেখেন আমি ওদিকে না যাই (রবিবারের ঘটনা)। কিন্তু যেভাবে আমরা ক্রিকেট খেলেছি পুরো টুর্নামেন্টে, আমার কাছে মনে হয় আমরা চ্যাম্পিয়নদের মতোই খেলেছি। নকআউট পর্ব বাদ দিয়ে পুরো গ্রুপ পর্বে। এত দলের মধ্যে আমাদের স্থানীয় খেলোয়াড়রা সমানে থেকে পারফর্ম করেছে।

মেহেদি দারুণ এক টুর্নামেন্ট কাটিয়েছে, সাইফউদ্দিনের ভালো টুর্নামেন্ট গেছে, লিটন কয়েকটি ইনিংসে ভালো খেলেছে। ইমরুল কিছু ভালো ইনিংস খেলেছে। আমি এইসব কিছুতে খুশি।’

অনেক আগে কোয়ালিফায়ার নিশ্চিত হওয়ার পর এভাবে বিদায় নেওয়াটা তামিমের কাছে এমন, ‘আমার মনে হয় এটা ক্রিকেটে হয়। এমন না যে কুমিল্লার সঙ্গেই প্রথম হলো। আমার কাছে একটাই খারাপ লাগে যে, পুরো টুর্নামেন্টে আমরা চ্যাম্পিয়নের মতো খেললাম, কিন্তু আসল সময়ে আমাদের দুটি খারাপ দিন গেল।’

ম্যাচ হারার পেছনে বোলিং বিভাগকেই দুষলেন তামিম, ‘আজকের (সোমবার) খেলা নিয়ে যদি বলি, আমরা খারাপ বল করেছি। ওদের ব্যাটসম্যানরা দারুণ ব্যাটিং করেছে। আমরা যেভাবে শুরু করেছিলাম, তাতে করে ১৩-১৪ ওভার পর্যন্ত ম্যাচে ছিলাম। ওই সময় উদানার ওভারে রান নিতে না পেরেই পিছিয়ে পড়ি আমরা।’

রংপুর সংগ্রাম করে প্লে অফ খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। সেই রংপুরের কাছে হারের পর তামিম বললেন, ‘যারা সংগ্রাম করে ওঠে, তাদের ভাগ্যটা পক্ষে থাকে।

এছাড়া নক আউট পর্যায়ে ওদের দুই-একজন সুপারস্টার একাই ম্যাচ বের করে নিয়েছে। আগের ম্যাচে গেইল, আজ ব্রেন্ডন (ম্যাককালাম) ও (জনসন) চার্লস। তারা যেভাবে খেলছে এটা ক্রিকেটের জন্য ভালো, বিপিএলের জন্য ভালো।’

এর আগে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার ম্যাচে আগেই হতাশ করে দেওয়া কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সকে ৩৬ রানে হারিয়ে আসরটির ফাইনালে জায়গা করে নিল রংপুর রাইডার্স। প্রথমে ব্যাট করা রংপুর নির্ধারিত ২০ ওভার শেষে জনসন চার্লসের ঝড়ো সেঞ্চুরিতে তিন উইকেট হারিয়ে ১৯২ রান তোলে। জবাবে ২০ ওভারের শেষ বলে অলআউট হলে ১৫৬ রানের বেশি করতে পারেনি কুমিল্লা।

আজ (মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর) সাকিব আল হাসানের ঢাকা ডায়নামাইটসের বিপক্ষে ফাইনালে লড়বে মাশরাফির রংপুর। আর এ ম্যাচে হারের মধ্যদিয়ে বিদায় নিল লিগে সবার ওপরে থেকে প্লে-অফ নিশ্চিত করা তামিম ইকবালের কুমিল্লা।

১৯৩ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা ভালো করে কুমিল্লা। তবে দলীয় ৫৪ রানে আক্রমণাত্মক খেলতে থাকা তামিম ইকবালকে ফেরান রংপুর অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা।

১৯ বলে ছয়টি চার ও একটি ছক্কায় ৩৬ করে সোহাগ গাজীকে ক্যাচ দেন তিনি। পরের ওভারেই শূন্য রানে থাকা ইমরুল কায়েসকে আউট করেন গাজী।

ব্যক্তিগত ১০ রানে শোয়েব মালিককে ফিরিয়ে রংপুরকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এনে দেন নাজমুল ইসলাম। চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে প্যাভিলিওনে ফেরেন লিটন দাশ। ২৮ বলে তিন চার ও দুই ছক্কায় ৩৯ রানে থাকা এ ওপেনারকে ফেরান ইসুরু উদানা।

শেষ দিকে মারলন স্যামুয়েলস (২৭) ও জস বাটলার (২৬) চেষ্টা করলেও কুমিল্লাকে জয়ের বন্দরে নিতে পারেননি। দু’জনকেই আউট করেন রবি বোপারা। সর্বোচ্চ তিন উইকেট পান রুবেল হোসেন। দুটি উইকেট পেয়েছেন উদানাও। একটি করে উইকেট নেন গাজী, মাশরাফি, ও নাজমুল ইসলাম।

এর আগে দ্বিতীয় দিন ব্যাটিংয়ে নেমে আক্রমণাত্মক খেলেন জনসন চার্লস ও ব্র্যান্ডন ম্যাককালাম জুটি। তারা দু’জনে মিলে ১৫১ রানের জুটি গড়েন।

তবে নিউজিল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ম্যাককালাম ৪৬ বলে একটি চার ও নয়টি ছক্কায় ৭৮ করে বিদায় নেন। কিন্তু তিন অঙ্কের ঘরে ঠিকই পৌঁছে যান ওয়েস্ট ইন্ডিজের তারকা চার্লস।

৬৩ বলে নয়টি চার ও সাতটি ছক্কায় তিনি ১০৫ রান করে অপরাজিত থাকেন। ক্রিস গেইলের পর চলমান আসরে এটি দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। তবে মজার কথা দুটি সেঞ্চুরিই এসেছে রংপুরের হয়ে।

রংপুরের ব্যাটিংয়ের সামনে এদিন অসহায় ছিলেন কুমিল্লার বোলাররা। মেহেদি হাসান, মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন, আল-আমিন হোসেন ও গ্রায়েম ক্রেমারদের ইকোনোমি ছিল দশের ওপর। অবশ্য ব্যতিক্রম ছিলেন পাকিস্তানের হাসান আলী। এমন দিনেও চার ওভারে মাত্র ২৩ রান দিয়ে একটি উইকেট তুলে নেন তিনি। বাকি একটি করে উইকেট পান মেহেদি ও সাইফুদ্দিন।

এর আগে এ ম্যাচ নিয়ে রোববার (১০ ডিসেম্বর) কম নাটক হয়নি। বৃষ্টি বাধার কারণে অসমাপ্ত খেলাটি একদিন পিছিয়ে ফের শুরু করার নির্দেশনা আসে।

শনিবার টসে জিতে মাশরাফির রংপুরকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছিলেন তামিমের কুমিল্লা। তবে সাত ওভার খেলার পর নির্মম বৃষ্টি হানা দেয়। যা শেষ হতে খেলার নির্ধারিত সময়ই পেরিয়ে যায়।

বিপিএলের বাইলজ অনুযায়ী ফাইনাল ছাড়া অন্য ম্যাচে রিজার্ভ ডে নেই তাই কাট অফ টাইম শেষ হলেই খেলা পরিত্যক্ত। সেক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী, পরিত্যক্ত ম্যাচে যারা পয়েন্ট টেবিলে এগিয়ে থাকবে তারাই টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠে যাবে। কিন্তু বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল খেলাটি একদিন পিছিয়ে দেয়। জানানো হয় খেলা যেখানে শেষ হয়েছে, পরদিন ঠিক সেখান থেকেই শুরু হবে।

শনিবার রংপুর সাত ওভার খেলে এক উইকেট হারিয়ে ৫৫ রান তোলে। আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি করা ক্রিস গেইল মাত্র তিন রানেই বিদায় নেন। ১০ বলে খেলে তিনি মেহেদি হাসানের শিকার হন। তবে আরেক ওপেনার জনসন চার্লস ২৬ বলে চারটি চার ও সমান ছক্কায় ৪৬ রান করে অপরাজিত ছিলেন। তার সঙ্গে চার রানে মাঠ ছাড়েন ব্র্যান্ডন ম্যাককালাম।

সবমিলিয়ে বর্তমানে সমালোচনায় বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। আগেই ফাইনালে জায়গা করে নেওয়া ঢাকা ডায়নামাইটসের কোচ খালেদ মাহমুদ সুজনও জানালেন, নিয়ম ভাঙা হয়েছে। তার মতে, ম্যাচটি সুপার ওভারে শেষ হলেও পারত।

রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত পাঁচ ওভারের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার নিয়ম ছিল। কিন্তু মাঠ প্রস্তুত করতে গিয়ে রাত ৯.৪০ বেজে যায়। সেক্ষেত্রে ম্যাচ খেলতে রাজি ছিলেন না কুমিল্লার অধিনায়ক তামিম ইকবাল। যদিও সুপার ওভারের সুযোগ ছিল। কিন্তু সেখান থেকে সরে এসে একদিন ম্যাচ পেছানোর সিদ্ধান্ত নেয় টুর্মামেন্ট কমিটি! যেখানে রিজার্ভ ডে ছিলই না।

এমন অবস্থায় ম্যাচটিতে নিয়ম ভাঙার প্রশ্ন আসতেই পারে। সোমবার মিরপুরে অনুশীলনের সময় এ নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন সুজন। তার কণ্ঠেও নিয়ম ভাঙা হয়েছে, সেই ইস্যুটি স্পষ্ট।

তিনি বলেছেন, আমি জানি না নিয়ম ভাঙা হল কি না। বাইলজ ঠিকমতো পড়া উচিত। সেখানে অনেক কিছু ক্লিয়ার আছে।

তিনি বলেন, আমার মনে হয়েছে যেটা নিয়ম ভাঙা হয়েছে, কালকে খেলাটা এক ওভার করে শেষ হয়ে গেলেই পারত (সুপার ওভার করে)। কাল সেরকম একটা অপশন ছিল।

তিনি আরও বলেন, ‘বাইলজের একটা ধারায় আছে, সেখানে ম্যাচ টাই বা নো রেজাল্ট হয় (দুই পক্ষ পাঁচ ওভার করে ব্যাটিংয়ের সুযোগ না পেলে) সুপার ওভার হবে। সেটা কিন্তু ক্লজের বাইরে ছিল না। সেক্ষেত্রে কালকে সুপার ওভার হয়ে আমরা কালকেই জেনে যেতাম প্রতিপক্ষ কে। কিন্তু বিপিএলের জন্য, যেখানে এতগুলো মানুষ জড়িত থাকে, মিডিয়া থাকে, সবকিছু থাকে। মানুষ এত টাকা খরচ করে দূর থেকে খেলা দেখতে আসে। সাধারণ মানুষের জন্য ৭০০ টাকা দিয়ে ক্লাব হাউজের টিকিট কেনা, সেই সঙ্গে আসা যাওয়া খাওয়া। খেলাটা মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ।’

সুজনের মতে ক্লজে যেটা স্পষ্ট করে বলা আছে, সেখানে তর্কের কোনও সুযোগ নেই। কোনও প্রতিপক্ষ এমন সময় কেন দেরি করবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বলেছেন, ‘কেন দেরি হল, আমি জানি না। ম্যাচ রেফারি, আম্পায়াররা ভাল বলতে পারবে। কিন্তু দিন শেষে খেলা হওয়াটা বড় ব্যাপার।’

ম্যাচে রংপুর রাইডার্স আগে ব্যাট করতে নেমে পাঁচ ওভারে এক উইকেট হারিয়ে ৫৫ রান তুলিছিল। যতদূর খেলা হয়েছিল সোমবার সেখান থেকেই খেলা হচ্ছে। একদিনের ব্যবধানে এই ম্যাচের জয়ী দল ফাইনালে ঢাকা ডায়নামাইটসের বিপক্ষে লড়বে।